সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে কয়েকজন ছেলের কটূক্তি, পিছু নেওয়া কিংবা পথ আটকে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা একটি মেয়ের শিক্ষাজীবন বদলে দিতে পারে। প্রথমে ভয়ে সে কাউকে কিছু বলে না। আশঙ্কা করে, পরিবার হয়তো তাকেই দোষ দেবে, বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দেবে কিংবা তার সম্মান নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। একসময় স্কুলে যাওয়াও বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে হয়রানিকারীর অপরাধের মূল্য দিতে হয় ভুক্তভোগীকে; সংকুচিত হয় তার চলাফেরা, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা।
নারীর প্রতি হয়রানিকে অনেক সময় ‘ইভ টিজিং’ বলে হালকা করে দেখা হয়। অথচ অশালীন মন্তব্য, ইঙ্গিতপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি, পথ আটকে দাঁড়ানো, বারবার পিছু নেওয়া, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, হুমকি কিংবা মুঠোফোনে অশালীন বার্তা পাঠানো—সবই হয়রানির রূপ হতে পারে। কারও সম্মতি ছাড়া তাকে ভয়, অপমান বা অস্বস্তির মধ্যে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এর প্রভাব তাৎক্ষণিক ঘটনার গণ্ডি ছাড়িয়ে শিক্ষাজীবনেও পড়ে। হয়রানির শিকার মেয়েরা নিরাপদ বোধ না করায় যাতায়াতের পথ বদলাতে পারে, ক্লাসে মনোযোগ হারাতে পারে, বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকতে পারে কিংবা পড়াশোনা ছেড়ে দিতে পারে। পরিবারের উদ্বেগ থেকেও তাদের কোচিং, খেলাধুলা ও বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে অপরাধীর আচরণের কারণে ভুক্তভোগীর শিক্ষার অধিকারই বাধাগ্রস্ত হয়।
নীরবতার পেছনেও রয়েছে নানা ভয়। পরিবার দোষারোপ করতে পারে, সামাজিকভাবে হেয় হতে পারে কিংবা অভিযোগ করলে হয়রানি বেড়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা অনেক মেয়েকে মুখ খুলতে দেয় না। এই নীরবতাকে সম্মতি বা দুর্বলতা ভাবা ভুল। অনেক সময় পরিবার নিরাপত্তার কথা ভেবে মেয়েটির চলাফেরা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু তাতে হয়রানিকারীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীর জীবনই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০২১ সালের এক গবেষণায় ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী কিশোরী ও তরুণীদের মধ্যে ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতা বা হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। এসব অভিজ্ঞতার কথা বলা মেয়েদের ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ নীরব থাকার কথা জানায়। গবেষণায় ৩১ দশমিক ২ শতাংশ পড়াশোনায় মনোযোগ হারানো, ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকা এবং ১৪ দশমিক ২ শতাংশ পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছে। এই পরিসংখ্যান গবেষণায় অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পাওয়া; একে দেশের সব শিক্ষার্থীর চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
সমস্যার গভীরে রয়েছে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও। মেয়েদের পোশাক ও চলাফেরা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও অনেক সময় হয়রানিকারীর আচরণকে ‘দুষ্টুমি’ বা ‘ছেলেমানুষি’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। এতে ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা হয় এবং অপরাধী জবাবদিহির বাইরে থেকে যায়। অথচ হয়রানির শিকার হওয়া কোনো মেয়ের লজ্জার বিষয় নয়। পরিবারের সম্মান রক্ষার দায়ও তার একার নয়।
নিরাপত্তার নামে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। বরং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা, বিদ্যালয়ে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা কার্যকর করা এবং হয়রানিকারীর বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
পরিবারের উচিত মেয়েটির কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাকে বিশ্বাস করা এবং দোষারোপ না করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিদ্যালয় ও কলেজে অভিযোগ জানানোর সহজ, গোপনীয় ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা থাকতে হবে। ২০০৯ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানির অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তে অভিযোগ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়। ২০২৩ সালেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব কমিটি গঠনের নির্দেশ বাস্তবায়নের বিষয়টি আদালতে গুরুত্ব পায়। তবে কমিটি গঠনই যথেষ্ট নয়; শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জানতে হবে কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে এবং অভিযোগের পর ভুক্তভোগী যেন কোনো চাপ বা প্রতিশোধের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
পথে হয়রানি দেখলে নিরাপদভাবে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো, দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা পরিবহনকর্মীদের জানানো এবং প্রয়োজনে সহায়তা চাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে এবং ভুক্তভোগীর পরিচয় ও গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনবিষয়ক সহায়তার জন্য সরকারি টোল ফ্রি হেল্পলাইন ১০৯ এবং তাৎক্ষণিক বিপদে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা যায়। শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, নির্ধারিত অভিযোগ কমিটি, অভিভাবক কিংবা বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্কের কাছেও ঘটনা জানানো যেতে পারে। সম্ভব হলে ঘটনার তারিখ, স্থান ও প্রাসঙ্গিক বার্তার তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণ করা উচিত; তবে প্রমাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে নিজের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না।
একটি মেয়ের নীরবতা অপরাধীর নির্দোষতার প্রমাণ নয়। অনেক সময় সেই নীরবতা ভয়, সামাজিক চাপ ও অবিশ্বাসের ফল। তাকে পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য না করে নিরাপত্তা, সহায়তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের দায়িত্ব।




