বাংলাদেশে নারীরা শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা ও নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছেন। নিজের যোগ্যতায় আয় করছেন, কর্মক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করছেন, গড়ে তুলছেন স্বতন্ত্র পরিচয়। কেউ কেউ স্বামীর চেয়েও বেশি আয় করছেন। কিন্তু নারীর এই অগ্রযাত্রাকে পরিবার ও সমাজ কতটা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারছে, সেই প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
একজন নারীর সাফল্যে পরিবারের আনন্দিত হওয়ার কথা। অথচ কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই সাফল্যই সংসারে অস্বস্তি ও বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বামীর আপত্তিতে স্ত্রীকে চাকরি ছাড়তে হয়, ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধার মুখে পড়তে হয় কিংবা নিজের উপার্জিত অর্থ ব্যবহারের স্বাধীনতা হারাতে হয়। সব ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এমন নয়, তবে এসব অভিজ্ঞতা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার একটি দিক সামনে আনে।
সমস্যাটিকে শুধু পুরুষের ঈর্ষা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের সামাজিক ধারণা—পুরুষ পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ও সিদ্ধান্তদাতা হবেন, আর নারী সংসারের দায়িত্ব সামলাবেন। নারী যখন এই প্রচলিত ভূমিকার বাইরে গিয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেন, তখন কিছু পরিবারে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর অবদান উল্লেখযোগ্য। পোশাকশিল্প, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যাংকিং, প্রশাসন, প্রযুক্তি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে নারীরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। তবে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পাশাপাশি সেখানে টিকে থাকা, ন্যায্য মজুরি পাওয়া এবং নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও তাঁদের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এর সঙ্গে রয়েছে অবৈতনিক গৃহস্থালি ও যত্নের কাজের অসম বোঝা। চাকরি বা ব্যবসার দায়িত্ব পালনের পরও অনেক নারীকে রান্না, সন্তান লালন-পালন, ঘর সামলানো এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের যত্ন নিতে হয়। ফলে কর্মজীবী নারীর কাজের দিন প্রায়ই অফিসের সময়সীমায় শেষ হয় না। অথচ সংসারের দায়িত্ব ভাগাভাগির প্রশ্নে পুরুষের অংশগ্রহণ সব পরিবারে সমান নয়।
স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করলে পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়তে পারে। কিন্তু প্রচলিত মানসিকতায় কেউ কেউ স্ত্রীর বেশি আয়কে নিজের মর্যাদার জন্য হুমকি মনে করেন। অথচ পরিবারের সাফল্য কোনো প্রতিযোগিতা নয়। একজনের অগ্রগতি অন্যজনের ব্যর্থতা প্রমাণ করে না।
আয় করা আর অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়াও এক বিষয় নয়। একজন নারী উপার্জন করলেও নিজের অর্থ কোথায় ব্যয় করবেন, ব্যবসায় কতটা বিনিয়োগ করবেন কিংবা চাকরি পরিবর্তন করবেন কি না—এসব সিদ্ধান্তে স্বাধীনতা না থাকলে তাঁর ক্ষমতায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পরিবারের আর্থিক সিদ্ধান্তে নারীর মতামত ও অধিকার নিশ্চিত করাও তাই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার বিভিন্ন জরিপে অর্থনৈতিক নির্যাতন ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের বিষয়টি উঠে এসেছে। কারও উপার্জন কেড়ে নেওয়া, প্রয়োজনীয় খরচের অর্থ না দেওয়া কিংবা অর্থ ব্যবহারে অযৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্পর্কের মধ্যে অসম ক্ষমতার প্রকাশ হতে পারে। তবে পারিবারিক আর্থিক সিদ্ধান্ত যৌথভাবে নেওয়া আর জোর করে নিয়ন্ত্রণ করা এক বিষয় নয়।
নারীর আত্মবিশ্বাসকেও সমাজ কখনো কখনো ভিন্নভাবে বিচার করে। পুরুষ নিজের মত দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করলে তাঁকে নেতৃত্বগুণসম্পন্ন বলা হয়; নারী একই কাজ করলে তাঁকে অহংকারী বা কঠিন স্বভাবের তকমা দেওয়া হয়। কর্মজীবী নারীকে আবার প্রায়ই সংসারের প্রতি কম মনোযোগী বলে সমালোচনা করা হয়। এ ধরনের দ্বৈত মানদণ্ড নারীর অগ্রযাত্রাকে আরও কঠিন করে তোলে।
এ ক্ষেত্রে পুরুষের ওপর আরোপিত সামাজিক প্রত্যাশাগুলোকেও নতুন করে দেখা প্রয়োজন। পুরুষকেই সব সময় বেশি আয় করতে হবে, সব সিদ্ধান্ত নিতে হবে কিংবা পরিবারের একমাত্র ভরসা হতে হবে—এমন ধারণা পুরুষের ওপরও চাপ সৃষ্টি করে। স্ত্রী বেশি আয় করলে বা পদমর্যাদায় এগিয়ে গেলে স্বামীর মর্যাদা কমে যায় না। বরং পারস্পরিক সহযোগিতায় পরিবার আরও স্থিতিশীল হতে পারে।
নারীর সাফল্য সম্পর্ক ভাঙার অনিবার্য কারণ নয়। পারস্পরিক সম্মান, খোলামেলা যোগাযোগ, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ এবং গৃহস্থালি দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টন একটি সম্পর্ককে শক্তিশালী করে। সমস্যা তৈরি হয় যখন একজনের অগ্রগতিকে অন্যজনের পরাজয় হিসেবে দেখা হয়।
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ শুধু নারীর কর্মসংস্থান বাড়ানো নয়; তাঁদের অর্জনকে পরিবার ও সমাজে মর্যাদা দেওয়াও। নারীর কাজের সুযোগ, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পুরুষেরও সমান অংশীদার হিসেবে গৃহস্থালি ও যত্নের দায়িত্ব নেওয়া প্রয়োজন।
নারীর সাফল্যের জন্য অনুমতি নয়, প্রয়োজন সমান সুযোগ ও সম্মান। স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করলে সেটি কোনো পরাজয় নয়; বরং পরিবারের সম্মিলিত অর্জন। কারণ পরিবার প্রতিযোগিতার জায়গা নয়, অংশীদারত্বের জায়গা। নারী ও পুরুষ একে অপরের অগ্রগতিকে সম্মান করতে শিখলেই প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব।