মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স নেওয়ার নির্দেশনা এবং আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে জটিলতায় হোমিওপ্যাথিক ওষুধ আমদানিতে সংকট তৈরি হয়েছে। আমদানিকারকদের দাবি, ফিনিশড ডোজেজ ফর্মের ওষুধ আমদানিতে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক কি না, তা আইনে স্পষ্ট নয়। এ অবস্থায় আমদানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে পড়ছেন চিকিৎসক ও রোগীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১৩ সেপ্টেম্বর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ওষুধ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাইসেন্স নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে চিঠি দেয়। এতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ (সংশোধিত-২০২৬)-এর ১০ ধারার উপধারা ১-এর দফা ‘গ’ এবং ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর ৭৪ ধারা উল্লেখ করা হয়। তবে আমদানিকারকদের অভিযোগ, হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ফিনিশড ডোজেজ ফর্মের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনার প্রয়োগ নিয়ে স্পষ্টতা নেই। ফলে বিভিন্ন স্থানে লাইসেন্স নিতে ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণ রাজস্ব দিতে হচ্ছে বলেও তারা দাবি করেছেন।
বর্তমানে দেশে ১৬টি প্রতিষ্ঠান হোমিওপ্যাথিক ওষুধ আমদানি করে এবং প্রায় ২৬টি কোম্পানি এসব ওষুধ উৎপাদন করে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গত দুই বছর ধরে এ-সংক্রান্ত প্রশাসনিক জটিলতায় আমদানিকারক ও খুচরা বিক্রেতারা সমস্যায় পড়ছেন। উচ্চ আদালতে মামলা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেও এখন পর্যন্ত কার্যকর সমাধান মেলেনি।
সংকটের প্রভাব পড়েছে চিকিৎসাসেবায়ও। বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে প্রতিদিন চার শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ কমে যাওয়ায় রোগীদের চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ওষুধ না পেয়ে অনেক রোগীকে বিভিন্ন দোকানে ঘুরতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন সেখ বলেন, আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে অস্পষ্টতার কারণে কিডনি ও হৃদ্‌রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু হোমিওপ্যাথিক ওষুধ আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। তার মতে, হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ও এর কাঁচামালে অ্যালকোহল ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আইনি জটিলতা দূর করা জরুরি। এতে চিকিৎসকেরা প্রয়োজনীয় ওষুধ পাবেন এবং রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হবে না।
গত ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ এবং স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবদের কাছে চিঠি দেন। মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংজ্ঞায় ‘হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ব্যতীত’ বাক্যটি যুক্ত করার অনুরোধ জানানো হয় ওই চিঠিতে।
ডিএইচএমএস ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন অ্যান্ড মেডিসিনাল প্লান্ট ইমপোর্টার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব ডা. মো. মজিবুল্যাহ মজিব বলেন, হোমিওপ্যাথিক ওষুধ আমদানিতে মাদক আইনের প্রয়োগ চিকিৎসা শিক্ষা ও ওষুধসংক্রান্ত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এতে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়ছে এবং চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। হয়রানি বন্ধ না হলে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক সংগঠনের সভাপতি ডা. মোস্তাক বিন হোসাইন বলেন, হোমিওপ্যাথিক ফিনিশড ডোজের ওষুধ আমদানিতে বিদ্যমান ওষুধসংক্রান্ত বিধানের সঙ্গে মাদক আইনের প্রয়োগের সমন্বয় প্রয়োজন। অ্যালকোহলযুক্ত হোমিওপ্যাথিক ওষুধের বিষয়ে আইনি অস্পষ্টতা দূর করে হয়রানি বন্ধের দাবি জানান তিনি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করেই অধিদপ্তর দায়িত্ব পালন করছে। তবে সুনির্দিষ্ট আইনি অস্পষ্টতা বা যৌক্তিক জটিলতা থাকলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ফিনিশড ডোজের ক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে বাজারে জটিলতা ও ওষুধসংকট তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিরসনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং আইনি ও প্রশাসনিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আমদানিকারক ও চিকিৎসকদের দাবি, দ্রুত আইনি ব্যাখ্যা স্পষ্ট করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে হোমিওপ্যাথিক ওষুধের সরবরাহ সংকট আরও বাড়তে পারে। এতে স্বল্প খরচে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের ভোগান্তিও বাড়বে।