মশাবাহিত ডেঙ্গুতে চলতি বছর দেশে প্রাণহানির সংখ্যা ৪১৮-তে পৌঁছেছে। অক্টোবরেই মারা গেছেন ১৭৩ জন, যা এ বছরের মাসভিত্তিক মৃত্যুর সর্বোচ্চ সংখ্যা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নভেম্বরেও সংক্রমণ চলতে পারে। ডিসেম্বরের আগে ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন না তারা। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ। সেপ্টেম্বর মাসে ১৪৮ জনের মৃত্যু হলেও অক্টোবরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৩ জনে।
ডেঙ্গুর পাশাপাশি হামের সংক্রমণও দেশের স্বাস্থ্যসেবায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হামে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ১ হাজার ২০০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপের চিত্রও উদ্বেগজনক। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক মির্জা গোলাম সারওয়ারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক দিনে ৬৭ জন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার পর সেখানে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭৯ জনে। তার ভাষ্য, অনেক রোগী এমন অবস্থায় হাসপাতালে আসছেন, যখন তাদের রক্তচাপ অত্যন্ত কমে যায় এবং শরীরে অক্সিজেনের মাত্রাও বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে আসে। শক সিন্ড্রোমে আক্রান্ত রোগীও পাওয়া যাচ্ছে।
অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর মতে, দ্বিতীয়বার বা পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে। রোগ শনাক্তে বিলম্ব এবং সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়াও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। তাই উপসর্গ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা নেওয়া এবং মশার প্রজননস্থল নির্মূলের ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
এ ধরনের পুনঃসংক্রমণের অভিজ্ঞতা হয়েছে ঢাকার বাসিন্দা ফয়সাল ফেরদৌসের। ৩৩ বছর বয়সী এই ব্যক্তি ২০১৭ ও ২০২৪ সালের পর চলতি মাসের শুরুতে তৃতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। তার স্ত্রীও একই সময়ে সংক্রমিত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তাদের পাঁচ বছর বয়সী ছেলে অন্য অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। সেখানে কয়েক দিন অবস্থানের পরপরই স্বামী-স্ত্রী দুজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। বারবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার অভিজ্ঞতায় শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি গুরুতর অসুস্থতার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল বলে জানান ফয়সাল।
ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন বা সেরোটাইপের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এক সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য সেরোটাইপে সংক্রমিত হলে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধব্যবস্থার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর টিকা চালুর বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও এখনো টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়নি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশারের পূর্বাভাস, নভেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ পুরোপুরি থামবে না। অক্টোবরের মতো মৃত্যুহার আরও বাড়ার সম্ভাবনা না থাকলেও সংক্রমণ মাসজুড়ে চলতে পারে। ডিসেম্বরের আগে পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য স্বস্তি আসার সম্ভাবনাও তিনি কম বলে মনে করছেন।
তার ব্যাখ্যা, বৃষ্টির সময় জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন এখনো চলছে। আবহাওয়া শুষ্ক হলেও এসব জমে থাকা পানির উৎস থেকে মশা জন্মাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টি ও আর্দ্রতার স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আসায় মশার বংশবিস্তারের অনুকূল সময় দীর্ঘ হচ্ছে। ফলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ মৌসুমও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।