দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের বড় অংশ পুরুষ হলেও মৃত্যুর হিসাবে নারীর সংখ্যা বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০২ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৬২ দশমিক ১ শতাংশ এবং নারী ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৩৬৮ জনের মধ্যে ১৯২ জন নারী ও ১৭১ জন পুরুষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের অসুস্থতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়া, চিকিৎসা নিতে দেরি, আর্থিক সংকট এবং সামাজিক বৈষম্য মৃত্যুঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের নারীরা সংসারের দায়িত্ব ও চিকিৎসার ব্যয়ের কারণে সময়মতো স্বাস্থ্যসেবা নিতে পিছিয়ে পড়েন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া পুরুষের সংখ্যা ৭৩ হাজার ৩৮২ এবং নারীর সংখ্যা ৪৪ হাজার ৮৭৫। অন্যদিকে, মৃতদের মধ্যে নারী ৫২ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং পুরুষ ৪৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ। লিঙ্গভিত্তিক হিসাবে কিছু মৃত্যুর তথ্যের হিসাব মেলেনি।
২৬ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের ঝুঁকি বেশি
বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৬ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ৫২ হাজার ৫৩১, যা মোট আক্রান্তের ৪৪ দশমিক ৩২ শতাংশ। এ বয়সীদের মধ্যে পুরুষ ৩১ হাজার ৮২৭ এবং নারী ২০ হাজার ৭০৪ জন।
মৃত্যুর ক্ষেত্রেও এ বয়সসীমায় নারীর সংখ্যা বেশি। এ বয়সী ১৭৩ জন মৃতের মধ্যে নারী ৯৮ এবং পুরুষ ৭৫ জন। অর্থাৎ, ২৬ থেকে ৫০ বছর বয়সী মৃতদের ৫৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ নারী।
বিশিষ্ট রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গুতে নারীদের মৃত্যুর পেছনে সামাজিক বৈষম্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের তুলনায় অনেক নারী নিজের অসুস্থতাকে কম গুরুত্ব দেন। আবার পরিবারের সদস্যরাও কখনো কখনো নারীর চিকিৎসার প্রয়োজনকে যথাযথ গুরুত্ব দেন না।
তার মতে, চিকিৎসার খরচ, সংসারের দায়িত্ব এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের দেখাশোনার চিন্তা নারীদের চিকিৎসা নিতে দেরি করাতে পারে। গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু হলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। এ ছাড়া মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ থাকলে শারীরিক জটিলতার ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে।
রাজধানীর মাতুয়াইলের মা ও শিশু ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তাহমিনা ডেইজি বলেন, গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু হলে মা ও শিশুর গুরুতর জটিলতার আশঙ্কা থাকে। রক্তের অণুচক্রিকা কমে যাওয়া, রক্তক্ষরণ ও যকৃতের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া গর্ভপাত, সময়ের আগে সন্তান জন্ম এবং শিশুর কম ওজনের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, শুধু গর্ভবতী নারী নয়, অন্য নারীদের ক্ষেত্রেও জ্বরকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। পুষ্টির ঘাটতি ও রক্তস্বল্পতার বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
চিকিৎসা ও সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ
ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমাতে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য চিকিৎসা সহজলভ্য করতে হবে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরীক্ষা, রোগী শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। চিকিৎসার ব্যয় কমানোর পাশাপাশি রোগীর পরিবারের জন্য সামাজিক সহায়তা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ডা. তাহমিনা ডেইজি বলেন, নারীদের ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতন করার ক্ষেত্রে পরিবারের পুরুষ সদস্যদেরও যুক্ত করতে হবে। জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং ডেঙ্গুর সতর্কসংকেত সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। পাড়া-মহল্লায় প্রচার, হাসপাতালের বহির্বিভাগে স্বাস্থ্যপরামর্শ এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা নারীদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীর অসুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়া, দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং আর্থিক বাধা কমানো গেলে ডেঙ্গুজনিত জটিলতা ও মৃত্যু কমানোর সুযোগ বাড়বে।