মেডিকেল কলেজ থেকে নার্সিং ইনস্টিটিউট—স্বাস্থ্য খাতের শিক্ষা কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। দেশের সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজের মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৬৩ শতাংশ ছাত্রী। ডেন্টাল শিক্ষায়ও নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষায় তাদের অংশগ্রহণ প্রায় ৯০ শতাংশ। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই অগ্রগতির তুলনায় সরকারি চাকরিতে চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের অংশ এখনো কম।
ব্যানবেইসের ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫’ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশের ১০৯টি মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী ছিলেন ৫১ হাজার ৩১৩ জন। তাদের মধ্যে নারী ৬২ দশমিক ৭৯ শতাংশ। সরকারি মেডিকেল কলেজে ছাত্রীদের হার ৬১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। বেসরকারি মেডিকেল কলেজে এই হার আরও বেশি, ৬৩ দশমিক ৬০ শতাংশ।
এ চিত্র বলছে, চিকিৎসক হওয়ার লক্ষ্যে উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় আগের পরিসংখ্যানেও এর প্রমাণ রয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এমবিবিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৪৮ হাজার ৭৭৭ জনের মধ্যে ২৬ হাজার ৯০১ জনই ছিলেন নারী।
কিন্তু সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের সেই সংখ্যাধিক্য প্রতিফলিত হয়নি। ৩৯তম বিশেষ বিসিএসে চিকিৎসক নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা ৬ হাজার ৭৯২ জনের মধ্যে ৫৩ শতাংশ পুরুষ ও ৪৭ শতাংশ নারী ছিলেন। ৪২তম বিশেষ বিসিএসে চার হাজার চিকিৎসকের মধ্যে পুরুষের হার ছিল প্রায় ৫১ শতাংশ, নারীর ৪৯ শতাংশ। অথচ এসব পরীক্ষায় আবেদনকারীদের মধ্যে নারীর অংশ ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশের বেশি।
চিকিৎসার পাশাপাশি ডেন্টাল, নার্সিং ও ধাত্রীবিদ্যা শিক্ষাতেও নারীদের উপস্থিতি জোরালো। দেশের ৩৫টি ডেন্টাল কলেজ ও ডেন্টাল ইউনিটের শিক্ষার্থীদের ৬০ দশমিক ৮৫ শতাংশ নারী। আর ৪৭৫টি নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ নারী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষায় নারীদের অগ্রগতির সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে সুযোগের সামঞ্জস্য তৈরি করা জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ মনে করেন, ভর্তি পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে ছাত্রীদের এগিয়ে থাকা ইতিবাচক। তবে মফস্বল এলাকার কর্মপরিবেশসহ বিভিন্ন বাস্তবতায় নারী চিকিৎসকদের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। বিশেষায়িত চিকিৎসার বিভিন্ন শাখায় তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোও প্রয়োজন।
চিকিৎসকদের বিশেষায়িত ক্ষেত্র নির্বাচনের বিষয়ে ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ ও আইসিডিডিআরবির গবেষকদের একটি গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৬ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে নিবন্ধিত ৩৪ হাজার ৬৯৭ জন চিকিৎসকের ৫২ শতাংশ ছিলেন নারী। গবেষণায় পুরুষ চিকিৎসকদের মধ্যে মেডিসিন ও সার্জারিতে এবং নারী চিকিৎসকদের মধ্যে গাইনি ও প্রসূতিবিদ্যায় বিশেষ দক্ষতার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ‘প্লস ওয়ান’ সাময়িকীতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।
চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের অগ্রগতি স্বাস্থ্য খাতের জনবল তৈরিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে নিয়োগের পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বিশেষায়িত চিকিৎসায় বৈচিত্র্য, পদোন্নতি ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নারীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।




