চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম পদত্যাগের খবর নাকচ করে সুস্থ হয়ে ক্যাম্পাসে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর তাকে প্রশাসনিক ভবন থেকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। বুধবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি জানান, পদত্যাগ কিংবা চুয়েট ক্যাম্পাসে আর না ফেরার বিষয়ে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।
উপাচার্যের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে চিকিৎসকদের সমন্বয়ে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়। উপাচার্য বলেন, ক্যাম্পাস থেকে উদ্ধারের সময় তার অবস্থা এমন ছিল যে কথা বলাও সম্ভব হচ্ছিল না। সুস্থ হয়ে দায়িত্বে ফিরতে চান তিনি।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা চুয়েট ক্যাম্পাসে পৌঁছান। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা শেষে প্রশাসনিক ভবনে আটকে থাকা উপাচার্য ও তার সঙ্গীদের বের করে আনা হয়। তাদের কয়েকজনকে অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এর আগে সোমবার সকালে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে প্রশাসনিক ভবনে নিজ কার্যালয়ে যান অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। শিক্ষার্থীদের লাগানো তালা ভেঙে তিনি কার্যালয়ে প্রবেশ করেছেন—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্দোলনকারীরা ভবনের সামনে জড়ো হন। তারা উপাচার্যকে ভবন ছাড়ার সময় বেঁধে দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি বের না হওয়ায় ভবনের ফটকে পুনরায় তালা দেওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ।
অবরুদ্ধ অবস্থায় উপাচার্য ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের খাবার ও পানি সরবরাহ করা হয়। রাতের দিকে কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়লে চুয়েট মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসকেরা তাদের চিকিৎসা দেন। পরে উপাচার্যের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। মঙ্গলবার দুপুরে তিনি গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রশাসনের সহায়তাও চান।
চুয়েটে এই সংকটের সূত্রপাত সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে। আন্দোলনকারীদের দাবি, অধ্যাপক সায়েম দায়িত্ব নেওয়ার ৫৬ দিনের মাথায় তাকে সরিয়ে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে গত ২১ সেপ্টেম্বর উপাচার্যের কার্যালয়ে তালা দেওয়া হয়। পরদিন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশ সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে। নতুন উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তারা। মঙ্গলবার উপাচার্যকে উদ্ধারের সময় আন্দোলনকারীরা তাকে আর ক্যাম্পাসে না ফেরার শর্ত দেন। কিন্তু অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম বুধবার জানান, তিনি পদত্যাগ করেননি এবং এমন কোনো প্রতিশ্রুতিও দেননি।
এদিকে শিক্ষার্থীদের বহনকারী যমুনা ও বুড়িগঙ্গা নামের দুটি বাসে হামলার অভিযোগও পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করেছে। সোমবার চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের হাটহাজারীর নাজুমিয়াহাট এলাকায় বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে সড়ক আটকে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল বাস দুটিতে হামলা চালিয়েছে বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ। পরে চট্টগ্রাম নগরীর চাঁন্দগাঁও এলাকাতেও আরেকটি হামলার অভিযোগ তোলেন তারা। হামলার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা।
প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবির পাশাপাশি তার সঙ্গে থাকা একজনকে হত্যা মামলার আসামি উল্লেখ করে গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়। পুলিশ সুপার বলেন, অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের কারও বিরুদ্ধে চলমান মামলা থাকলে তাকে আটক করা হবে। তবে হামলার ঘটনা, হামলাকারীদের পরিচয় এবং মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে মঙ্গলবার রাজধানীর শাহবাগে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে মানববন্ধন করেন চুয়েটের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। বুয়েট ও রুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
উপাচার্যকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পরও চুয়েটের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়নি। একদিকে নতুন উপাচার্য দায়িত্ব পালনে ফিরতে আগ্রহী, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে অনড়। দুই পক্ষের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা কবে কাটবে, তা এখনো অনিশ্চিত।