দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের অর্ধেকের বেশি এখনো জন্মসনদ হাতে পায়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বয়সী শিশুদের জন্মনিবন্ধনের হার ৫৯ শতাংশ হলেও জন্মসনদ রয়েছে মাত্র ৪৭ শতাংশের। ফলে প্রায় ৪১ শতাংশ শিশুর জন্ম নিবন্ধনের আওতার বাইরে।
বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে উঠে আসা এ চিত্রে জন্মনিবন্ধন কার্যক্রমে অগ্রগতির পাশাপাশি সেবা পৌঁছে দেওয়ার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে। ২০১৯ সালে জন্মনিবন্ধনের হার ছিল ৫৬ শতাংশ এবং জন্মসনদ থাকার হার ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ পাঁচ বছরে হার বাড়লেও প্রতিটি শিশুর আইনগত পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
জন্মনিবন্ধন শিশুর অস্তিত্বকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। জন্মসনদ না থাকলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য সরকারি সেবা গ্রহণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। শিশুর বয়স প্রমাণের নথি না থাকলে বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রম প্রতিরোধেও প্রশাসনিক কার্যক্রম বাধার মুখে পড়তে পারে।
এ ছাড়া শিশু পাচার, নির্যাতন কিংবা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনায় পরিচয় শনাক্ত ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার কাজ কঠিন হয়ে যায়। তাই জন্মনিবন্ধনকে কেবল দাপ্তরিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি শিশুর অধিকার সুরক্ষার অন্যতম ভিত্তি।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধনের হার বাড়লেও জন্মসনদ হাতে পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবধান রয়ে গেছে। কোনো শিশুর জন্ম সরকারি নথিতে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও পরিবার সনদের কপি না পেলে প্রয়োজনের সময় তা কাজে লাগাতে পারে না। ফলে নিবন্ধন সম্পন্ন করার পাশাপাশি সনদ সরবরাহ ও তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
দারিদ্র্য, মায়ের শিক্ষার স্তর, ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবারের স্থানান্তরের মতো বিষয় জন্মনিবন্ধনে প্রভাব ফেলতে পারে। স্থায়ী ঠিকানার অভাব, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের জটিলতা, যাতায়াত ব্যয় এবং অনলাইন ব্যবস্থায় সমস্যার কারণে দরিদ্র ও অভিবাসী পরিবারের শিশুরা পিছিয়ে পড়তে পারে। নগর বস্তি, পথশিশু ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্যও বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে জন্মের পর শিশুর নিবন্ধন, নাম ও জাতীয়তার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। একইভাবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১৬.৯ নম্বর লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য আইনগত পরিচয় নিশ্চিত করার কথা রয়েছে।
এ লক্ষ্য অর্জনে জন্মের তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবাকে যুক্ত করা, হাসপাতাল ও টিকাদানকেন্দ্রে নিবন্ধনের সুযোগ বাড়ানো এবং প্রত্যন্ত এলাকা ও নগর বস্তিতে ভ্রাম্যমাণ নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। দরিদ্র পরিবারের জন্য তথ্য সংশোধন ও সনদ সংগ্রহের প্রক্রিয়াও সহজ করা প্রয়োজন।
সরকারি তথ্যব্যবস্থার সমন্বয়, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিবন্ধনের পর সনদ পরিবারের হাতে পৌঁছেছে কি না, তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে অগ্রগতি বাড়তে পারে। প্রতিটি শিশুর জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা মানে তার পরিচয়, অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সেবায় প্রবেশের পথ সুগম করা।