দীর্ঘ প্রায় নয় বছর বন্ধ থাকার পর দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে রাজধানীর ওসমানী উদ্যান। সংস্কার ও আধুনিকায়ন শেষে নতুন সাজে চালু হওয়া উদ্যানটিতে প্রবেশ করতে জনপ্রতি ১০ টাকা টিকিট নির্ধারণ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। তবে দীর্ঘদিন পর নগরবাসীর অবসর ও শরীরচর্চার জায়গাটি খুললেও প্রবেশমূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দর্শনার্থী ও নগর-পরিকল্পনাবিদদের কেউ কেউ।
গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আধুনিকায়ন করা ওসমানী উদ্যান এবং সেখানে নির্মিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেন। পরদিন মঙ্গলবার সকাল থেকে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উদ্যানটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
উদ্যানটি চালু হওয়ার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে যান পুরানা পল্টনের এক বাসিন্দা। তবে প্রবেশপথে টিকিটের কথা শুনে বিস্মিত হন তিনি। দুজনের জন্য তাকে ২০ টাকা দিতে হয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর উদ্যানটি খুললেও প্রবেশের জন্য অর্থ দিতে হবে, এমনটি প্রত্যাশা করেননি তিনি।
ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম জানিয়েছেন, উদ্যানের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় মেটাতে প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তার ভাষ্য, প্রতিদিন উদ্যান পরিষ্কার রাখতে ১৫ থেকে ১৬ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রয়োজন। প্রবেশমূল্য না থাকলে আশপাশের কিছু মানুষ উদ্যানের পরিবেশ নষ্ট করতে পারেন বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তবে নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, জনসাধারণের জন্য নির্মিত পার্ক ও খেলার মাঠে প্রবেশমূল্য আরোপ অন্যায্য। তার মতে, এসব উন্মুক্ত স্থান নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও সুস্থতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। নিয়মিত হাঁটতে আসা মানুষকে প্রতিবার টাকা দিয়ে প্রবেশ করতে হলে অনেকে পার্কে আসা কমিয়ে দিতে পারেন। উদ্যানের উন্নয়নকাজে অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও কংক্রিটের ব্যবহার নিয়েও তদন্তের প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
১৪৭ কোটি টাকার উন্নয়ন
নগর ভবন ও বাংলাদেশ সচিবালয়ের মাঝখানে অবস্থিত ওসমানী উদ্যানের আয়তন ২১ দশমিক ৮৫ একর। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর নামে উদ্যানটির নামকরণ করা হয়। রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সবুজের পরিসর ও অবসর কাটানোর জায়গা হিসেবে এর গুরুত্ব দীর্ঘদিনের।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে ১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে উদ্যানটির উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ‘গোস্বা নিবারণী পার্ক’ নামে নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন কারণে কাজ দীর্ঘায়িত হয়।
প্রথম দফায় দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিলের পর ২০২৩ সালে নতুন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। পরে নকশা পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের ব্যয় ও কাজের পরিধিতে পরিবর্তন আসে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ ও দুটি প্রবেশপথ নির্মাণের জন্য প্রথমে ৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও পরে তা কমিয়ে ৩৯ কোটি টাকা করা হয়। সব মিলিয়ে উদ্যানটিতে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে প্রায় ১৪৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
উন্নয়নকাজের আওতায় সীমানাপ্রাচীর, হাঁটার পথ, জলাশয়ের পাড়, ঘাট, নগর জাদুঘর, গ্রন্থাগার, জিমনেসিয়াম, দোকান, গাড়ি রাখার স্থান ও বিদ্যুতের উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া নির্মিত হয়েছে ৯০ ফুট উঁচু জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ। এর ব্রোঞ্জের গায়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের নাম খোদাই করা হয়েছে। উদ্যানের দুই পাশের প্রবেশপথে তৈরি করা হয়েছে ‘২৪’ সংখ্যার আদলে দুটি ফটক। তবে উদ্বোধনের পরও নগর জাদুঘর, গ্রন্থাগার, জিমনেসিয়াম, গাড়ি রাখার জায়গা ও খাবারের দোকানগুলো চালু হয়নি। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে আধুনিকায়নের পরও উদ্যানের সব সুবিধা এখনই পাচ্ছেন না দর্শনার্থীরা।
সবুজের জায়গায় কংক্রিট, জলাশয়ে ময়লা
উদ্যানটি চালুর পর এর পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, ভেতরের দুটি জলাশয়ের একটিতে পানি নেই। অন্যটিতে পানি থাকলেও ভাসছে কচুরিপানা ও প্লাস্টিকের বোতল। পানিতে আবর্জনা ও শেওলার উপস্থিতিও চোখে পড়েছে। উদ্যানের ভেতরে পড়ে থাকতে দেখা গেছে নির্মাণসামগ্রী।
একসময় গাছপালায় ঘেরা এই উদ্যানকে অনেকে ‘ঢাকার ফুসফুস’ বলতেন। কিন্তু সংস্কার ও নির্মাণকাজের সময় বহু গাছ কাটা হয়েছে। এ নিয়ে পরিবেশবাদীরা প্রতিবাদও করেছিলেন। ‘ওসমানী উদ্যানের ১১ হাজার গাছ রক্ষা আন্দোলন’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে গাছ সংরক্ষণের দাবি তোলা হয়েছিল।
নগর-পরিকল্পনাবিদদের অভিযোগ, উন্নয়নকাজে কংক্রিটের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় উদ্যানের প্রাকৃতিক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের মতে, পার্কের বড় অংশজুড়ে স্থাপনা নির্মাণের পরিবর্তে গাছপালা, উন্মুক্ত মাটি ও সবুজ জায়গা সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল। প্রচলিত ইমারত বিধিমালায় পার্কের আয়তনের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের বিধান থাকার কথা উল্লেখ করে তারা এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের
উদ্যানের উন্নয়ন ও সংস্কার প্রকল্পের পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রকল্পের কাজ শেষে উদ্যানটি ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়া বা পরিচালনার দায়িত্ব বুঝিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত সিটি করপোরেশনই এর রক্ষণাবেক্ষণ করবে। এ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই প্রবেশপথে টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
রাজধানীতে উন্মুক্ত স্থান ও সবুজের সংকটের মধ্যে ওসমানী উদ্যান চালু হওয়া নগরবাসীর জন্য স্বস্তির খবর। তবে এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী করতে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, জলাশয় ও গাছপালা সংরক্ষণ এবং অসম্পূর্ণ সুবিধাগুলো চালুর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহজ প্রবেশাধিকার বজায় রাখাও জরুরি।