কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় শুরু হয়েছে শুঁটকি উৎপাদনের ব্যস্ত মৌসুম। সাগরে মাছ ধরার ওপর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা গত ২৯ অক্টোবর শেষ হওয়ার পর জেলেদের জালে ধরা পড়ছে নানা প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ। এসব মাছ প্রক্রিয়াজাত করে শুঁটকি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন হাজারো শ্রমিক। চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদনের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
কক্সবাজার পৌরসভার ১ ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের ১৮টি গ্রাম নিয়ে গড়ে ওঠা নাজিরারটেক শুঁটকি পল্লি এ শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এখানে ছোট-বড় প্রায় ৬০০টি মহাল রয়েছে। এ ছাড়া টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, মহেশখালী ও সোনাদিয়াতেও শুঁটকি উৎপাদন করা হয়। সব মিলিয়ে জেলার আট শতাধিক মহালে প্রতিদিন ১৫০ মেট্রিক টনের বেশি শুঁটকি তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বৃহস্পতিবার নাজিরারটেকের বিভিন্ন মহাল ঘুরে দেখা যায়, গভীর সমুদ্র থেকে মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরছেন জেলেরা। ব্যবসায়ীরা সেসব মাছ কিনে শ্রমিকদের মাধ্যমে পরিষ্কার করে বাঁশের মাচায় শুকানোর জন্য সাজিয়ে রাখছেন। লইট্টা, ছুরি, পোপা, মাইট্যা, ফাইস্যা ও রূপচাঁদাসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ দিয়ে তৈরি হচ্ছে শুঁটকি। এ কাজে বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিকও নিয়োজিত রয়েছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, শুঁটকি উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে কক্সবাজারে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ যুক্ত। শীত মৌসুমে দেশজুড়ে চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি পর্যটকদের কেনাকাটাও এ ব্যবসায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে কাঁচা মাছের সরবরাহ ও বাজারদরের ওপর উৎপাদন এবং মুনাফা অনেকাংশে নির্ভর করে।
নাজিরারটেক শুঁটকি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি নেয়ামত উল্লাহ জানান, উৎপাদিত শুঁটকি গুদামে সংরক্ষণের পর প্রতি সপ্তাহে দুই দিন ট্রাকে করে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। ইতোমধ্যে পাঁচ দিনে ৩০ ট্রাক শুঁটকি সরবরাহ করা হয়েছে। কাঁচা মাছের দাম বেশি হওয়ায় এবার শুঁটকির বাজারদরও বেড়েছে।
বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি ছুরি শুঁটকি ১ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা, লইট্টা ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং পোপা ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রূপচাঁদা শুঁটকির দাম ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার শুঁটকির দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কক্সবাজারে ৩৯ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪২ হাজার মেট্রিক টন। বর্তমান উৎপাদনের ধারা অব্যাহত থাকলে নির্ধারিত লক্ষ্য ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ শুঁটকি মাছ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুল শুক্কুর জানান, গত বছর জেলার প্রায় ৪০টি মহাল থেকে হংকং, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় পোপা শুঁটকি রপ্তানি করে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আয় হয়েছে। এবার রপ্তানি আয় ৩০০ কোটি টাকায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা দেখছেন তিনি।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকার মতে, গত বছর জেলায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল। আবহাওয়া ও সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ অনুকূলে থাকলে এবার সেই পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। পাশাপাশি পর্যটক ও ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ, বিষমুক্ত শুঁটকি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।


