শিল্পাঞ্চল খুলনায় একের পর এক পুরোনো শিল্পকারখানা বন্ধ হলেও নতুন কিছু বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতে অবদান রাখছে। তবে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় জেনারেটর চালানো নিয়ে পরিবেশগত অভিযোগ ও প্রশাসনিক নির্দেশনায় এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নগরীর আড়ংঘাটা এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ঈশানা ননওভেন ফেব্রিক্স লিমিটেডে রপ্তানিমুখী বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে স্থানীয় প্রায় ৮০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় জেনারেটর চালাতে না পারলে প্রতি ঘণ্টায় বড় ধরনের উৎপাদন ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
সম্প্রতি জেনারেটরের শব্দদূষণের অভিযোগে পরিবেশ অধিদপ্তরে পাঁচজনের স্বাক্ষরযুক্ত একটি অভিযোগ দেওয়া হয়। তবে অভিযোগকারীদের কয়েকজন পরে লিখিতভাবে জানান, ৩০ মার্চের অভিযোগপত্রে তাদের স্বাক্ষর নকল করা হয়েছে এবং তারা অভিযোগ করেননি। তাদের দাবি, ব্যক্তিগত জমি বিক্রির বিরোধকে কেন্দ্র করে কারখানাটির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। অন্যদিকে কারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখার দাবিতে স্থানীয়দের পক্ষ থেকেও পরিবেশ অধিদপ্তরে পাল্টা আবেদন করা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সরেজমিন পরিদর্শনে কারখানার পাশের একটি বাড়িতে ৭৫ ডেসিবেল শব্দমাত্রা রেকর্ড করা হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এরপর জেনারেটর সাউন্ডপ্রুফ কক্ষে স্থাপন, শব্দ ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তর ও পূর্বদিকের জানালা ও এক্সস্ট ফ্যান বন্ধ রাখাসহ বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়। এজন্য কারখানা কর্তৃপক্ষকে ৪৫ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, ইতোমধ্যে উত্তর ও পূর্বদিকের জানালা-এক্সস্ট ফ্যান বন্ধ রাখা, সাউন্ডপ্রুফ ব্যারিকেড ও ককশিট ব্যবহারের মাধ্যমে শব্দদূষণ প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমানো হয়েছে। তবে আধুনিক জেনারেটর ও সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ স্থাপনে অতিরিক্ত জমি প্রয়োজন। পাশের জমির মালিকরা বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দাম চাওয়ায় জমি কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও দাবি তাদের।
কারখানার জেনারেল ম্যানেজার জামিউল হাসান বলেন, ‘এলাকার মানুষের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ আমরা করব না। পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী শব্দ ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমানো হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের জন্য পর্যাপ্ত সময় ও জায়গা প্রয়োজন। যৌক্তিক দামে জমি পাওয়া গেলে এবং সময় দেওয়া হলে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।’
স্থানীয় বাসিন্দা বাকের ঢালী বলেন, ‘এই কারখানায় এলাকার শত শত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকলে কারখানা চালাতে জেনারেটর প্রয়োজন। কারখানা বন্ধ হোক—এটা আমরা চাই না।’ এক দোকানি বলেন, ‘সমস্যার তুলনায় কারখানা থেকে উপকার বেশি। শব্দদূষণ কিছুটা মেনে নেওয়া গেলেও তা নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) খুলনা জেলা সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, কোনো অভিযোগ পাওয়ার পর তা যাচাই না করে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ঠিক নয়। অভিযোগকারীর স্বার্থসংশ্লিষ্টতা আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অন্যথায় খুলনায় চালু থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী কাজী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, বিষয়টি নিয়ে একজন সাংবাদিক তাদের জানিয়েছেন। তিনি পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে অভিযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ বলেন, কারখানাটির পক্ষে-বিপক্ষে একাধিক অভিযোগ এসেছে। দুই পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করতে পারে। কারখানাটি বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়। এজন্য ৪৫ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। সময় শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কারখানাটির পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে, যার মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত।