বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার ধারণা ছড়িয়ে দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিচিতি অর্জন করেছেন বাংলাদেশের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) তাকে কোনো পদ, কমিটি কিংবা আন্তর্জাতিক উদ্যোগ থেকে বাদ দিয়েছে—এমন দাবির পক্ষে সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাকে বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে রাজনৈতিক চাপ, কূটনৈতিক বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত অসন্তোষকে দায়ী করার সুযোগ নেই।
ঘটনাটির বিশ্লেষণে প্রথমেই জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক পার্থক্য বোঝা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা। তবে জাতিসংঘের অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন উদ্যোগ, উপদেষ্টা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এক নয়। কোনো একটি সংস্থার দায়িত্ব থেকে কাউকে বাদ দেওয়া হলে সেটিকে অন্য সংস্থার সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করাও তথ্যগত বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
২০২৩ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ‘জিরো ওয়েস্ট’ বা বর্জ্যহীন উদ্যোগবিষয়ক বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এটি ছিল জাতিসংঘের একটি উদ্যোগ; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পদ নয়। ফলে ওই নিয়োগের সঙ্গে ডব্লিউএইচওর কোনো কথিত সিদ্ধান্তকে এক করে দেখার আগে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব বণ্টন, মেয়াদ শেষ হওয়া, কমিটি পুনর্গঠন, নতুন সদস্য নিয়োগ কিংবা কোনো উদ্যোগের কার্যক্রম পরিবর্তনের কারণে দায়িত্বে পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু এসব সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার কোনটি ড. ইউনূসের ক্ষেত্রে ঘটেছে, তার প্রমাণ ছাড়া কোনো একটি কারণকে চূড়ান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এখানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাও আলোচনায় আসতে পারে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে তার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে। তবে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করতে হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, সিদ্ধান্তপত্র কিংবা নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্র প্রয়োজন।
একইভাবে, ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক মর্যাদা এবং তার নেতৃত্বাধীন সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করা দুটি পৃথক বিষয়। তার নোবেল পুরস্কার কিংবা আন্তর্জাতিক পরিচিতি কোনো সংস্থার প্রতিটি সিদ্ধান্তে তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে না। আবার কোনো পদে তাকে না রাখা হলেও সেটিকে তার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখানো যায় না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ড. ইউনূসকে ঠিক কোন দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে? সংশ্লিষ্ট পদ বা উদ্যোগের নাম, আগের নিয়োগের তথ্য এবং সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের নথি পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। তখন বোঝা যাবে, সিদ্ধান্তটি নিয়মিত প্রশাসনিক পরিবর্তন, মেয়াদসংক্রান্ত বিষয়, নীতিগত মতপার্থক্য, নাকি অন্য কোনো কারণে নেওয়া হয়েছে।
সারকথা, ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাদ দিয়েছে—এমন দাবি এখন পর্যন্ত যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া এ নিয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যেমন বিভ্রান্তিকর, তেমনি বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলাও অযৌক্তিক নয়। বরং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের নথি ও সংস্থার বক্তব্য সামনে এনে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করাই হবে তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণের সঠিক পথ।