১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল, তার পেছনে রয়েছে ৩০ লাখ শহীদের মহান আত্মত্যাগ ও ২ লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের ইতিহাস। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই স্বাধীন রাষ্ট্রের রূপকার ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তবে স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায়, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসে এক চরম রাজনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসে। 
সেই সংকটের ধারাবাহিকতায় ৩রা নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সুরক্ষিত প্রকোষ্ঠে সংঘটিত হয় ইতিহাসের অন্যতম বর্বরোচিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড। বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম শীর্ষ সংগঠক এবং বঙ্গবন্ধুর আজীবন রাজনৈতিক সহচর— সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে জেলের ভেতরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ঐতিহাসিক ও শোকাবহ এই জেল হত্যা দিবসে বাংলাদেশের ছাত্র ও তরুণ সমাজের পক্ষ থেকে জাতীয় চার নেতার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে জাতীয় চার নেতার অবদান প্রাতিষ্ঠানিক ও অনন্য। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি, তখন এই চার নেতাই অসীম দূরদর্শিতা ও সাহসিকতার সাথে ‘মুজিবনগর সরকার’ গঠন করেন। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাঁরই নির্দেশিত নীতি ও আদর্শকে ধারণ করে তারা নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। রাজনৈতিক মতভিন্নতা কিংবা ক্ষমতার লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে তাঁরা যেভাবে চরম সংকটের মুখেও নিজেদের ঐক্য ও নেতৃত্বের সততা বজায় রেখেছিলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসের যেকোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য এক অনন্য নজির। ১৯৭১ ও ১৯৭৫—উভয় সংকটের সময়েই তাঁরা প্রমাণ করেছেন যে, দেশ ও আদর্শের প্রশ্নে কোনো আপস চলে না।
কারাগারের অভ্যন্তরে বিচারহীনভাবে বন্দি থাকা অবস্থায় এই জাতীয় নেতাদের হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও দেশের প্রচলিত আইনের চরম লঙ্ঘন ছিল। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো আইনের শাসন। ঘাতক চক্র কেবল চারজন ব্যক্তিকে হত্যা করেনি, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নেতৃত্বশূন্য করার এবং দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার একটি সুদূরপ্রসারী অপচেষ্টা চালিয়েছিল।
আজকের ছাত্র ও তরুণ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে, জাতীয় চার নেতার জীবন ও রাজনীতি থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষণীয় বিষয় হলো সংকটের সময়ে অবিচল থাকা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে আদর্শিক ও নৈতিক রাজনীতির যে অভাব পরিলক্ষিত হয়, তা পূরণে এই মহান নেতাদের রাজনৈতিক সততা, নিখাদ দেশপ্রেম এবং প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
জাতীয় চার নেতার এই ঐতিহাসিক ত্যাগকে দলমত নির্বিশেষে মূল্যায়ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একজন সচেতন ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে পত্রিকার এই কলামের মাধ্যমে জোর দাবি জানাচ্ছি—৩রা নভেম্বরের জেল হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কুশীলব ও পলাতক আসামিদের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় এনে বিচারের রায় সম্পূর্ণ কার্যকর করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে এমন জঘন্য অপরাধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
ইতিহাসের নির্মম হত্যাকাণ্ডগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের জাতীয় জীবনে রাজনৈতিক পরমতসহিষ্ণুতা, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করাই হোক এই দিবসের মূল অঙ্গীকার। জাতীয় চার নেতার আপসহীন দেশপ্রেম ও আদর্শ চিরকাল বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে দেশ গঠনে অনুপ্রাণিত করুক।
শহীদ জাতীয় চার নেতার স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক: ছাত্রনেতা, মুহাম্মদ আলী মিঠুল