দেশের লবণাক্ততাপ্রবণ উপকূলীয় এলাকায় ধান উৎপাদন বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত ‘ব্রি ধান-১১৯’। রোপা আমন মৌসুমে চাষের জন্য নতুন এ জাতটি সম্প্রতি জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৬তম সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে।
মঙ্গলবার ব্রির প্রকাশনা ও জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা মো. আল আমিন এ তথ্য জানান।
ব্রির উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ এখলাছুর রহমানের নেতৃত্বে গবেষক দলটি নতুন জাত উদ্ভাবন করে। লোকেশন স্পেসিফিক টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট (এলএসটিডি) প্রকল্পের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণায় অংশ নেন হাসিনা খাতুন, নুসরাত জাহান, আরমিন আক্তার সেতু ও রিবেত ফারজানা দিশা।
নতুন জাতটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, মাত্র ১১৫ দিনের মধ্যে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব। উপকূলের লবণাক্ত জমির পাশাপাশি দেশের অন্যান্য এলাকাতেও এর আবাদ করা যাবে। ফলে আমন ধান কাটার পর একই জমিতে সরিষা বা সূর্যমুখীর মতো রবি ফসল উৎপাদনের সুযোগ পাবেন কৃষকরা।
গবেষকদের পরামর্শ অনুযায়ী, ১ থেকে ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে বীজ বপন করতে হবে। মাঝারি উঁচু ও উঁচু জমিতে ২৫ থেকে ৩০ দিন বয়সী চারা রোপণ উপযোগী। সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০ সেন্টিমিটার এবং গোছা থেকে গোছার দূরত্ব ১৫ সেন্টিমিটার রাখতে হবে। প্রতি গর্তে লাগাতে হবে দুই থেকে তিনটি চারা।
বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির তত্ত্বাবধানে দেশের ২০টি স্থানে লবণাক্ত ও সাধারণ পরিবেশে জাতটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি বোরো মৌসুমে চাষের জন্য জাতীয় কারিগরি কমিটির সুপারিশও পেয়েছে এটি। প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত অনুমোদন মিললে আমন ও বোরো—দুই মৌসুমেই জাতটি আবাদ করা সম্ভব হবে।
ফলনের দিক থেকেও জাতটি আশাব্যঞ্জক। উপযুক্ত পরিচর্যায় প্রতি হেক্টরে গড়ে ৫ দশমিক ৭ টন ধান পাওয়া যেতে পারে। পরিবেশ ও লবণাক্ততার মাত্রা অনুযায়ী ফলন ৪ দশমিক ৮ থেকে ৭ দশমিক ৬ টন পর্যন্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রচলিত ব্রি ধান-৭৩-এর তুলনায় এর ফলন প্রায় এক টন বেশি।
গাছের গড় উচ্চতা ১১৩ সেন্টিমিটার। শক্ত কাণ্ডের কারণে সহজে হেলে পড়ে না। চারা অবস্থায় টানা তিন সপ্তাহ ১২ ডেসিসিমেন্স/মিটার মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে জাতটি। অন্যদিকে, বৃদ্ধি ও প্রজননের সংবেদনশীল পর্যায়ে ৮ থেকে ১০ ডেসিসিমেন্স/মিটার লবণাক্ততা মোকাবিলার সক্ষমতা রয়েছে।
প্রতিটি শীষে গড়ে প্রায় ২১৫টি পুষ্ট ধান পাওয়া যায়। ব্রি ধান-৭৩-এর তুলনায় যা ৭০ থেকে ৮০টি বেশি। পাকা ধান শীষ থেকে সহজে ঝরে পড়ে না। চালের রং সাদা, আকৃতি মাঝারি চিকন এবং রান্নার পর ভাত ঝরঝরে হয়। এতে অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ।
ব্রির মহাপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম নতুন জাতটিকে কৃষি গবেষণার উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এর সম্প্রসারণ উপকূলীয় কৃষকদের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
প্রধান গবেষক মোহাম্মদ এখলাছুর রহমান জানান, গবেষণার প্রতিটি পর্যায়ে দলগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে জাতটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের কাছে এর সুফল পৌঁছে দেওয়াই এখন তাঁদের প্রত্যাশা।