একসময় আলু ছিল রংপুরের কৃষকদের নগদ আয়ের অন্যতম ভরসা। মৌসুম শেষে আলু বিক্রির টাকায় বছরের বড় একটি সময় সংসার চলত অনেক পরিবারের। কিন্তু উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, হিমাগারের ভাড়া এবং বাজারে দরপতনে সেই আলু এখন কৃষকদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। প্রতি ৬২ কেজির বস্তায় প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা লোকসানের হিসাব করছেন তাঁরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১২ বছরের সাত বছরই আলুচাষে লোকসান হয়েছে। বর্তমানে বাজারে ৬২ কেজির এক বস্তা আলু বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। অথচ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে বস্তাপ্রতি ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৯৫২ থেকে ২ হাজার টাকা।
কাউনিয়ার কৃষক জহুরুল জানান, এক বস্তা আলু উৎপাদনে তাঁর খরচ পড়ে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। হিমাগারে রাখার জন্য কেজিপ্রতি ৬ টাকা হিসাবে ৬২ কেজির বস্তায় ভাড়া লাগে ৩৭২ টাকা। অন্যান্য খরচ যোগ করলে ব্যয় আরও বাড়ে। ফলে বর্তমান বাজারদরে আলু বিক্রি করে খরচের বড় অংশই তুলতে পারছেন না কৃষকেরা।
কৃষকদের অভিযোগ, লোকসানের পাশাপাশি হিমাগারে রাখা আলুতে পচন ধরায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ছে। আলুচাষি ও ব্যবসায়ী মো. আবদুল লতিফ, মনসুর, মানিক ও মেঘু বলেন, উৎপাদনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় তাঁরা আর্থিক সংকটে পড়েছেন। মিঠাপুকুরের কৃষক হাবিবুরের আশঙ্কা, সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা না দিলে হিমাগারে থাকা বিপুল পরিমাণ আলু নষ্ট হতে পারে। বারবার লোকসান হলে আগামী দিনে অনেক কৃষক আলুচাষ থেকে সরে দাঁড়াবেন।
রংপুর কৃষি বিপণন কার্যালয়ের তথ্যমতে, গত মৌসুমে জেলার ৪২টি হিমাগারে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৮ মেট্রিক টন আলু রাখা হয়েছিল। ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে অবশিষ্ট ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৬১৭ মেট্রিক টন। ওই মৌসুমে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ কৃষক ৬৬ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ করেন। উৎপাদন হয় প্রায় ১৯ লাখ ৫৭ হাজার টন।
রংপুর বিভাগীয় আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যসচিব বিশ্বজিৎ বণিক জানান, গত মৌসুমে ৪২ একর জমিতে আলু চাষ করে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বস্তা উৎপাদন করেন তিনি। পরে লাভের আশায় ১৭ হাজার বস্তা আলু কিনে হিমাগারে সংরক্ষণ করেন। কিন্তু প্রায় ৭০ লাখ টাকা লোকসান হওয়ায় এবার আলুচাষ না করার কথা ভাবছেন। রংপুর কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক পলাশ কান্তি নাগ বলেন, উৎপাদন খরচ তুলতে না পারলে কৃষকদের পরিবার নিয়ে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রংপুর অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, দেশের মোট আলুর প্রায় ২৫ শতাংশ উৎপাদিত হয় রংপুর অঞ্চলে। অথচ উৎপাদিত আলুর মাত্র ২২ শতাংশ হিমাগারে সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। এ কারণে প্রতিবছরই সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে সংকট তৈরি হয়।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের রংপুরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. খায়রুল ইসলামের মতে, আলুর সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজার ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানি সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তা না হলে কৃষকেরা ধীরে ধীরে আলুচাষে আগ্রহ হারাবেন।