ফ্রান্সে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও সম্ভাব্য সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে শনিবার দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছে সরকার। গত সপ্তাহের বিক্ষোভে সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনার পর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের বিশেষ ইউনিটের পাশাপাশি হেলিকপ্টার, ড্রোন, সাঁজোয়া যান ও জলকামান প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবারের কর্মসূচি ঘিরে রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে জনসমাগম ও গণপরিবহন চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ জানান, গত সপ্তাহের তুলনায় এবার ১০ হাজার বেশি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
নুনেজ বলেন, সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত সপ্তাহে যেসব এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছিল, সেসব বিধিনিষেধও বহাল রাখা হয়েছে।
শ্রমিকদের কর্মসূচিতে অনুমতি, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা
প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বৃহস্পতিবার ঘোষণা দেন, শনিবার কেবল শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হবে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। তাদের অভিযোগ, এতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার সীমিত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। গত শনিবার দেশজুড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। একপর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
শুক্রবার শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন ম্যাক্রোঁ। ‘হাইস্কুল রিনিউয়াল’ সংগঠনের সভাপতি নাথানায়েল কম্বারি জানান, প্রেসিডেন্ট তাদের বক্তব্য শুনেছেন। তবে সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে বিধিনিষেধ
প্যারিসে রাতের কারফিউ সোমবার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। লিওঁর কেন্দ্রীয় এলাকায় জনসমাগম নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি কারফিউ ও গণপরিবহন চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মার্সেইতে বিশেষ বিবেচনায় শ্রমিক ইউনিয়নের একটি মিছিলের অনুমতি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে, ফ্রান্সের জাতীয় ছাত্র ইউনিয়ন ইউএনইএফ বিধিনিষেধের মধ্যেও শনিবার সমাবেশের ডাক দিয়েছে। ২০১৮ সালে আত্মপ্রকাশ করা সরকারবিরোধী ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের পক্ষ থেকেও প্যারিসের কেন্দ্রে পদযাত্রার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে পুলিশ ইউএনইএফ ও ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সমাবেশের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
মানবাধিকার ও ব্যবসায় প্রভাবের উদ্বেগ
বিক্ষোভে বিধিনিষেধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর অধিকারকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। অন্যদিকে, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত অস্ত্রের আঘাতে শিক্ষার্থী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের আহত হওয়ার খবর নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘর ও লুই ভুইতোঁ ফাউন্ডেশন শনিবার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ‘আর্ট বাসেল’ মেলাও নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগে শেষ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অরলিয়ঁ শহরে কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র‍্যালির কংগ্রেসের প্রতিবাদে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার মানুষের সমাগম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে শহরের কেন্দ্রে ওই জমায়েতের অনুমতি দেয়নি স্থানীয় প্রশাসন।
ফ্রান্সের বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবারের সহিংসতার পর থেকে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৭০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিক্ষোভের স্বাধীনতা, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে জনঅসন্তোষ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—এই তিন বিষয়কে ঘিরে দেশটিতে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
তথ্যসূত্র: আলজাজিরা ও রয়টার্স