চারদিকে শত্রুসেনা, আকাশে রুশ ড্রোনের নজরদারি। গুরুতর আহত শরীর নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের একটি পরিত্যক্ত অবস্থানে একাকী কেটে গেছে ৪৯১ দিন। বেঁচে থাকার জন্য একপর্যায়ে নিজের ক্ষতিগ্রস্ত পায়ের অংশ নিজেকেই কেটে ফেলতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত স্থলপথে উদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়ায় বিশেষ ড্রোনে করে তাকে উদ্ধার করেছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। অবিশ্বাস্য এই বেঁচে ফেরার গল্পের নায়ক ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের সেনাসদস্য কস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেঙ্কো।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২ জুন খারকিভ অঞ্চলের কুপিয়ানস্ক এলাকায় একটি সম্মুখসারির অবস্থানে দায়িত্ব পালন শুরু করেন ভ্লাসেঙ্কো। তার সঙ্গে ছিলেন এক সহযোদ্ধা। প্রথমে কংক্রিটের পানি নিষ্কাশন নালায় আশ্রয় নিলেও পরে সেখানে পানি ঢুকে পড়ায় তারা একটি পরিত্যক্ত ভবনে অবস্থান নেন। এদিকে রুশ ড্রোনের তৎপরতায় ওই এলাকায় সেনাদের যাতায়াত ও উদ্ধার অভিযান ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ ড্রোন হামলায় ভ্লাসেঙ্কোর দুই পা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার সহযোদ্ধাও নিহত হন। এরপর থেকে শত্রু পরিবেষ্টিত এলাকায় কার্যত একাই পড়ে থাকেন তিনি। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না পাওয়ায় তার পায়ের ক্ষত ভয়াবহ আকার ধারণ করে। নিজের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি পায়ের নিচের অংশ পচে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অন্য পায়ের ক্ষতিগ্রস্ত অংশও শেষ পর্যন্ত ছুরি দিয়ে নিজেকেই কেটে ফেলতে বাধ্য হন তিনি।
এমন পরিস্থিতিতেও ভ্লাসেঙ্কোকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে দেয়নি তার বাহিনী। ড্রোনের মাধ্যমে তার কাছে খাবার, পানি, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হতো। বেতার যোগাযোগে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের শত্রুপক্ষের গতিবিধি সম্পর্কেও তথ্য দিতেন। স্ত্রী তেতিয়ানা ও মেয়ে ক্রিস্টিনার স্মৃতি তাকে মানসিকভাবে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। স্ত্রীর পাঠানো উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন মার্কিন লেখক স্টিফেন কিংয়ের উপন্যাস ‘দ্য আউটসাইডার’।
স্থলপথে উদ্ধার করতে গিয়ে সেনাদের প্রাণহানির আশঙ্কা থাকায় শেষ পর্যন্ত বিকল্প পরিকল্পনা নেয় ইউক্রেনীয় বাহিনী। দেশটির ৯২তম অ্যাসল্ট ব্রিগেড, ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডসহ একাধিক সামরিক ইউনিট এবং ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গুরজুফ ডিফেন্সের সহযোগিতায় ভারী মাল বহনে সক্ষম একটি ড্রোনকে আহত মানুষ পরিবহনের উপযোগী করে পরিবর্তন করা হয়।
উদ্ধারের আগে ভ্লাসেঙ্কোর কাছে একটি মোবাইল ফোন পাঠানো হয়। তাতে ড্রোনের সঙ্গে নিজেকে কীভাবে যুক্ত করতে হবে, সে বিষয়ে ভিডিও নির্দেশনা ছিল। নির্দেশনা অনুসরণ করে তিনি বিশেষ বহনব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। এরপর ড্রোনটি তাকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। পরে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ইউক্রেনীয় সামরিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার অভিযানে প্রায় ৭৫ মিনিট সময় লাগে। এ সময় অন্য ড্রোনও অভিযানে সহায়তা করে। দীর্ঘ ৪৯১ দিনের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার পর উদ্ধার হওয়া ভ্লাসেঙ্কো নিজের বেঁচে ফেরাকে অলৌকিক ঘটনা বলে বর্ণনা করেছেন।
তার এই উদ্ধার শুধু একজন সেনাসদস্যের জীবন রক্ষার ঘটনা নয়; বিপজ্জনক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের নতুন ব্যবহারও তুলে ধরেছে। তবে এ ধরনের অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় নিয়মিত উদ্ধারব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে এর ব্যবহার কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সতর্কতা রয়েছে।



