ইসরায়েলের নির্বাচনে এগিয়ে থেকেও সরকার গঠনের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন না পাওয়ায় এখন জোটের শরিকদের পাশাপাশি অন্য দলগুলোর সমর্থন আদায়ের ওপর নির্ভর করতে হবে তাকে। অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরও এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন পায়নি। ফলে দেশটির পরবর্তী সরকার কারা গঠন করবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
জেরুসালেম পোস্টের লাইভ আপডেটে প্রকাশিত আংশিক ফল অনুযায়ী, ৮৪ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট গণনা শেষে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩টি আসন পেতে পারে। সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন শিবির এগিয়ে রয়েছে ৪৮টি আসনে। আরব দলগুলো এগিয়ে আছে ১৯টি আসনে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের আসনসংখ্যা ১২০। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন। সেই হিসাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে নেতানিয়াহুর জোটকে আরও আটটি আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে বে। আইজেনকোটের শিবিরের প্রয়োজন আরও ১৩টি আসন।
সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত কার হাতে?
ভোটের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে এমন একজন নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, যাঁর পক্ষে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের নেতাকেই যে দায়িত্ব দেওয়া হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং কে তুলনামূলক সহজে অন্য দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে পারবেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নতুন নির্বাচন এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন হারজগ। তবে কোনো পক্ষই প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে আবারও নির্বাচনে যেতে হতে পারে ইসরায়েলকে। দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের মধ্যে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনাও তাই আলোচনায় আসতে পারে।
নেতানিয়াহুর সামনে শরিক ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ
আংশিক ফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৬টি আসন পেতে পারে। তাঁর জোটের শরিক শাস, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও ওতজমা ইয়েহুদিত সাতটি করে এবং রিলিজিয়াস জায়নবাদ ছয়টি আসন পেতে পারে।
তবে জোটের শরিকদের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্ক অতীতে বিভিন্ন ইস্যুতে টানাপোড়েনের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ থেকে ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের অব্যাহতি দেওয়ার প্রশ্নে মতবিরোধ দেখা দেয়। ২০২৫ সালে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম জোট ছেড়ে যায়। একই ইস্যুতে শাস পার্টি মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেও তখন জোট ছাড়েনি।
গাজায় যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তির চুক্তি নিয়েও জোটে বিরোধ দেখা দিয়েছিল। ইতামার বেন-গভিরের নেতৃত্বাধীন ওতজমা ইয়েহুদিত ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জোট ছাড়লেও মার্চে আবার সরকারে যোগ দেয়। বেজালেল স্মোট্রিচের নেতৃত্বাধীন রিলিজিয়াস জায়নবাদ যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা করেও জোটে থেকে যায়।
এসব অভিজ্ঞতার কারণে এবারও নেতানিয়াহুর জন্য শরিকদের সমর্থন ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দল সমর্থন প্রত্যাহার করলে এবং বিকল্প সমর্থন না মিললে সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিরোধী শিবিরের ভরসা আরব দলগুলো
আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন শিবিরের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৪৮। এর মধ্যে তার ইয়াশার পার্টি ২১টি, নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের টুগেদার জোট ১২টি, ইয়ার গোলানের দ্য ডেমোক্র্যাটস আটটি এবং আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু সাতটি আসনে এগিয়ে রয়েছে।
এই অবস্থায় বিরোধী শিবিরের সামনে বড় প্রশ্ন—সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে তারা আরব দলগুলোর সমর্থন নিতে পারবে কি না। দ্য ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের জন্য আইজেনকোটের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট—দুই পক্ষই আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান আসনবিন্যাসে আরব দলগুলোর অবস্থান সরকার গঠনের হিসাব পাল্টে দিতে পারে। তাদের সমর্থন সরাসরি জোটে যোগদানের মাধ্যমে আসবে, নাকি পার্লামেন্টে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বাকি ভোটে বদলাতে পারে হিসাব
বিবিসি বাংলার এক ভিডিও প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ছয় লাখের বেশি অনুপস্থিত ভোটারের ব্যালট তখনো গণনা করা বাকি ছিল। তাদের বড় অংশ সেনাবাহিনীর সদস্য। এসব ভোটের হিসাব আসন বণ্টনে প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলে আংশিক ফলের ভিত্তিতে এখনই কোনো পক্ষের সরকার গঠন নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। ভোট গণনার চূড়ান্ত ফলের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমঝোতা, শরিকদের অবস্থান এবং প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত—সবকিছুই নির্ধারণ করবে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার কারা গঠন করবে।
আপাতত নেতানিয়াহু এগিয়ে থাকলেও তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন নিশ্চিত করা। আর বিরোধী শিবিরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা।



