বাংলাদেশে জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের ৪৫.৫ শতাংশ প্রযুক্তি-সহায়ক লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার (টিএফজিবিভি) শিকার হয়েছেন। সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে এ হার ৬৩.৭ শতাংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি, ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণা, ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে নির্যাতন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহারের মতো বিভিন্ন উপায়ে নারীরা এ সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজধানীতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আয়োজনে ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং অ্যান্ড অ্যাড্রেসিং টেকনোলজি ফ্যাসিলিটেটেড জেন্ডার বেইজড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণার তথ্য উপস্থাপন অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
সকাল ১১টায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম।
গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করেন ডিজিটাল রাইটসের হেড অব রিসার্চ আবদুল্লাহ তিতির এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সিনিয়র প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কর্মকর্তা আফরুজা আরমান।
গবেষণায় বলা হয়, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণী ও শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি-সহায়ক লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছেন। হয়রানি, লিঙ্গভিত্তিক শোষণ, অর্থনৈতিক প্রতারণা, যৌন ও ছবি-ভিত্তিক নির্যাতন, ভুয়া আইডি, সাইবার স্টকিং এবং এআই-নির্ভর ডিপফেক এ সহিংসতার উল্লেখযোগ্য ধরন।
গবেষণায় ফেসবুক ও মেসেঞ্জারকে অনলাইন সহিংসতার প্রধান মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ জানানোর পরও ৫৬ শতাংশ ভুক্তভোগী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন। ৫৬.৫ শতাংশ ভুক্তভোগী অপরাধীকে ব্লক করলেও মাত্র ৪.৬ শতাংশ পুলিশের সহায়তা নিয়েছেন। পুলিশের কাছে যাওয়া ভুক্তভোগীদের ৮১.৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের মামলায় সামান্য অগ্রগতি হয়েছে অথবা কোনো অগ্রগতিই হয়নি।
এ ছাড়া, ৭১.৬ শতাংশ নারী মনে করেন, অনলাইন সহিংসতার ঘটনায় সমাজে ভুক্তভোগীদেরই দোষারোপ করা হয়। ৬৭ শতাংশ নারী কখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনলাইন নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ পাননি। এসব সহিংসতার কারণে অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অংশগ্রহণ কমিয়ে দিচ্ছেন। কেউ কেউ পড়াশোনা, চাকরি কিংবা বাসস্থান পরিবর্তনেও বাধ্য হচ্ছেন।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, এ গবেষণার উদ্দেশ্য সামগ্রিক পরিসংখ্যান নির্ধারণ বা সহিংসতার প্রাদুর্ভাব পরিমাপ করা নয়; বরং এ ধরনের সহিংসতার কাঠামোগত দুর্বলতা ও সংকট চিহ্নিত করা। গবেষণায় বিভিন্ন অংশীজনের দায়িত্ব অনুযায়ী সমাধানের পথও তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি গবেষণায় উঠে আসা সুপারিশ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন। নারীর সুরক্ষার বিষয়টি গতানুগতিক পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রযুক্তির অপব্যবহারজনিত সহিংসতাকে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সামগ্রিক কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বলেন, জেন্ডার বৈষম্য দূর না হলে সাইবার অপরাধের নতুন ধরনগুলোর বিস্তার রোধ করা কঠিন।
স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম বলেন, নারী অধিকারভিত্তিক আন্দোলনমুখী সংগঠন হিসেবে ৫৬ বছরের অভিজ্ঞতায় তারা দেখেছেন, নারীর অগ্রগতির পথে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা বড় বাধা। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। এ লক্ষ্যেই ডিজিটাল ডায়েট ও ডিসমিস ল্যাবের সহযোগিতায় গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে।
ডিজিটাল রাইটসের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে নারীদের ওপর ডিজিটাল সহিংসতার ব্যাপ্তি ও নেতিবাচক প্রভাবও বাড়ছে। এআইয়ের অপব্যবহারে অল্প সময়ে ভুয়া ভিডিও তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে ভুক্তভোগীরা গুরুতর মানসিক চাপসহ বিভিন্ন ঝুঁকিতে পড়ছেন। এ সমস্যার কারণ চিহ্নিত করে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিরোধের কার্যকর কৌশল খুঁজে বের করাই গবেষণাটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
মুক্ত আলোচনায় প্রধান গবেষক সায়েমা চৌধুরী বলেন, ডিজিটাল সচেতনতার অভাব এবং টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশনের মতো নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে গৃহবধূ ও প্রবাসীদের স্ত্রীরা অর্থনৈতিক শোষণ ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। প্রাথমিক জরিপে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও যৌনকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি উল্লেখ করে তিনি ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তার মতে, অনলাইন হয়রানি ভার্চুয়াল জগতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি ভুক্তভোগীদের দৈনন্দিন জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলে।
গবেষক ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা ও অভিযোগের প্রতিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবহারের শর্তাবলি সহজবোধ্য বাংলায় উপস্থাপন, অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণ নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের উপ-পুলিশ কমিশনার লিজা বেগম পিএসসি বলেন, ভুক্তভোগীদের সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। থানাগুলো এখনো প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানে পুরোপুরি সক্ষম নয়। ভুয়া আইডি ব্যবহারকারীদের প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ এবং ভুক্তভোগীদের সচেতনতার অভাব মোকাবিলা করাও বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে তদন্তের জন্য মানসম্মত নির্দেশিকা অনুসরণ, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং ভুক্তভোগীদের সামাজিকভাবে পুনর্বাসনে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম, প্রধান গবেষক সায়েমা চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা। মুক্ত আলোচনায় প্রথম আলোর নাজনীন আখতার, বাংলাদেশ অ্যাফেয়ার্সের রীতা ভৌমিক, অ্যাডভোকেট সীমা বালা, ওয়াইডব্লিউসিএ অব বাংলাদেশের খ্রিষ্টিনা দিয়া বালা, দেশ টিভির সুমনা সুমী, নারীপক্ষের সৈয়দা সালমা পারভীন, এফপিএবির লুৎফুন নাহার, ব্লাস্টের উপদেষ্টা প্রিয়া আহসান, অ্যাকশনএইডের সিদরাতুল মুনতাহা, গণসাক্ষরতা অভিযানের সিজুল ইসলাম, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের রাশেদুল ইসলাম এবং ব্লাস্টের মণীষা বিশ্বাসসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেত্রী, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, কর্মকর্তা ও সাংবাদিকসহ প্রায় ৬৪ জন উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পাঠাগার সম্পাদক রীনা আহমেদ।



