ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি বাঙালির ঐতিহ্য, নারীসমাজের বন্ধন ও বিদায়ের আবেগের প্রকাশ এই আয়োজন। ঢাকের শব্দ, পূজামণ্ডপে ভিড়, দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি—এরই মধ্যে লাল সিঁদুরে রঙিন হয়ে ওঠেন অনেক নারী। কেউ দেবীর কপালে সিঁদুর পরিয়ে দেন, কেউ অন্যের মুখে সিঁদুর মাখিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এই পরিচিত দৃশ্যই বিজয়াদশমীর সিঁদুর খেলা। বাঙালি হিন্দু সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত এই রীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধর্মীয় আস্থা, দাম্পত্যজীবনের মঙ্গলকামনা এবং সামাজিক সম্প্রীতির নানা অনুষঙ্গ।
সাধারণভাবে বিবাহিত নারীরা এই আয়োজনে বেশি অংশ নেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গাকে সিঁদুর নিবেদন করে তারা স্বামী-সংসারের কল্যাণ, দাম্পত্যজীবনের স্থায়িত্ব ও পরিবারের সুখ-শান্তি কামনা করেন। পরে একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে শুভকামনা জানান। তবে অঞ্চল, পরিবার ও পূজার রীতিভেদে সিঁদুর খেলার ধরনে পার্থক্য থাকতে পারে।
এই আচারটির সঙ্গে বাঙালির দুর্গাপূজার আবেগময় কল্পনাও যুক্ত। প্রচলিত লোকবিশ্বাসে দুর্গা যেন ঘরের মেয়ে, যিনি প্রতিবছর বাপের বাড়িতে আসেন এবং বিজয়াদশমীতে ফিরে যান স্বামীর গৃহে। তাই দেবীর বিদায় আনন্দের পাশাপাশি বিষাদেরও। সিঁদুর খেলা সেই বিদায়কে ঘিরে তৈরি হওয়া আবেগকে একটি দৃশ্যমান রূপ দেয়। দেবীকে সিঁদুর পরানো এবং পরস্পরের মধ্যে সিঁদুর বিনিময়ের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও পুনরায় ফিরে আসার প্রত্যাশা।
কিন্তু সিঁদুরের তাৎপর্য কি কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসেই সীমাবদ্ধ? সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর আরও কিছু অর্থ সামনে আসে। পূজামণ্ডপে নারীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ, একে অপরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং আনন্দ ভাগ করে নেওয়া সামাজিক সম্পর্ককে দৃঢ় করার সুযোগ তৈরি করে। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতদের সঙ্গে এই মিলন অনেকের কাছে দুর্গোৎসবের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। এভাবেই একটি ধর্মীয় আচার সময়ের সঙ্গে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে যুক্তির জায়গা থেকেও বিষয়টি দেখা প্রয়োজন। সিঁদুরকে বিবাহিত নারীর পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে দেখা একটি সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি। কিন্তু সিঁদুরের সঙ্গে দীর্ঘ দাম্পত্যজীবন বা পারিবারিক সুখের কামনা যুক্ত থাকলেও, সিঁদুর খেলার মাধ্যমে এসব নিশ্চিত হয়—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কোনো আচার মানুষের বিশ্বাস, আবেগ ও মানসিক তৃপ্তির উৎস হতে পারে; কিন্তু সেই বিশ্বাসের প্রতীকী অর্থকে নিশ্চিত বাস্তব ফল হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সিঁদুর খেলার আনন্দ কি সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত? প্রচলিত আয়োজনটি প্রধানত বিবাহিত নারীদের ঘিরে হলেও উৎসবের বৃহত্তর বার্তা হওয়া উচিত অন্তর্ভুক্তি ও পারস্পরিক সম্মান। অবিবাহিত নারী, বিধবা কিংবা ভিন্ন জীবনপরিস্থিতিতে থাকা নারীরাও যেন উৎসবের আনন্দে নিজেদের আপন মনে করতে পারেন, সে বিষয়ে সামাজিক সংবেদনশীলতা জরুরি। ঐতিহ্যকে সম্মান করার অর্থ এই নয় যে সময়ের সঙ্গে সমাজে তৈরি হওয়া নতুন প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যেতে হবে।
ধর্মীয় আচারকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাই দুটি বিষয় পাশাপাশি রাখা প্রয়োজন—মানুষের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা এবং তথ্য ও যুক্তির প্রতি দায়বদ্ধতা। সিঁদুর খেলা কারও কাছে দেবীর আশীর্বাদ কামনার মাধ্যম, কারও কাছে পারিবারিক স্মৃতি, আবার কারও কাছে নারীসমাজের মিলন ও উৎসবের আনন্দ। এসব অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও, পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার সুযোগ রয়েছে।
বিজয়াদশমীর সিঁদুর খেলার তাৎপর্য শেষ পর্যন্ত লাল রঙের মধ্যেই আটকে নেই। এটি বিদায়ের মুহূর্তে শুভকামনা জানানোর, সম্পর্কের উষ্ণতা ভাগ করে নেওয়ার এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে স্মরণ করার একটি উপলক্ষ। এই আয়োজন যদি মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, সৌহার্দ্য ও মর্যাদাবোধ বাড়ায়, তবে তার সামাজিক মূল্য আরও গভীর হয়। উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য সেখানেই—যেখানে বিশ্বাসের পাশাপাশি থাকে মানবিকতা, আর ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় সবার প্রতি সম্মান।