মানুষের ইতিহাস যত পুরোনো, নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে তার প্রশ্নও তত পুরোনো। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কীভাবে সৃষ্টি হলো, প্রাণের উৎস কোথায়, মৃত্যুর পর কী ঘটে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান ও নানা আধ্যাত্মিক চিন্তার জন্ম দিয়েছে। কেউ এই অনুসন্ধানের কেন্দ্রে রেখেছেন ঈশ্বরকে, কেউ প্রকৃতিকে, কেউ মানুষের চেতনা ও যুক্তিকে। পথ আলাদা হলেও অজানাকে জানার আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিন্তাজগতের এক গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।
সৃষ্টিকর্তার ধারণা মানুষের কাছে কীভাবে ধরা দেয়, তা নিয়েও রয়েছে নানা মত। কেউ তাকে সাকার রূপে কল্পনা করেন, কেউ নিরাকার পরমসত্তা হিসেবে বিশ্বাস করেন। আবার কেউ মনে করেন, সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ তাদের কাছে নেই। এই ভিন্ন অবস্থানগুলো মানুষের দীর্ঘ চিন্তাচর্চার অংশ। বিশ্বাসের বিষয়টি তাই শুধু গ্রহণ বা বর্জনের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতি, দর্শন ও ব্যক্তিগত উপলব্ধি।
হিন্দু ধর্মে প্রতিমা সেই উপলব্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। মাটি, কাঠ কিংবা অন্য উপাদানে তৈরি প্রতিমা বস্তুগতভাবে জড় হলেও ভক্তের কাছে তা আরাধ্য দেবতার প্রতীকী রূপ। প্রাণপ্রতিষ্ঠার ধর্মীয় আচারের মধ্যদিয়ে প্রতিমাকে পবিত্র উপাসনার কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়। ভক্ত তখন প্রতিমার মধ্যে দেবীর মাতৃরূপ, শক্তি, স্নেহ ও কল্যাণের ভাবনা উপলব্ধি করেন। এই অর্থে প্রতিমা শুধু নির্মিত একটি অবয়ব নয়; তা বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম।
মানুষের কল্পনাশক্তি এখানে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কল্পনা মানে কেবল অবাস্তব কিছু ভাবা নয়। কল্পনা থেকেই মানুষ শিল্প সৃষ্টি করে, নতুন ধারণা নির্মাণ করে, ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখতে শেখে। তবে কল্পনা ও বাস্তবতা এক বিষয় নয়। মানুষ তার বিশ্বাসের মাধ্যমে কোনো কিছুর অর্থ খুঁজে পেতে পারে, কিন্তু সেই বিশ্বাসের সত্যতা যাচাইয়ের পদ্ধতি বিষয়ভেদে আলাদা। ধর্মীয় উপলব্ধি, দার্শনিক যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণকে তাই এক করে না দেখে তাদের স্বতন্ত্র অবস্থান বোঝা প্রয়োজন।
দুর্গাপূজায় দেবী দুর্গার প্রতিমা মাতৃশক্তির যে রূপ তুলে ধরে, তার মধ্যে রয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, অশুভের বিনাশ এবং শুভের প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা। দেবীকে ঘিরে ভক্তির পাশাপাশি রয়েছে একটি সামাজিক ও মানবিক বার্তাও—শক্তি যেন দুর্বলের সুরক্ষায় ব্যবহৃত হয়, সাহস যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায় এবং মমতা যেন মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে।
দেবী মাহাত্ম্যের বহুল পরিচিত স্তোত্রে উচ্চারিত হয়—
“যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ॥”
এর ভাবার্থ, যিনি সকল প্রাণীর মধ্যে শক্তিরূপে অবস্থান করছেন, সেই দেবীকে বারবার প্রণাম।
এই উচ্চারণের মধ্যে শক্তিকে সর্বজনীনভাবে উপলব্ধি করার একটি তাৎপর্য রয়েছে। মানুষ শুধু নিজের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে না; প্রকৃতি, জীবজগৎ এবং পরস্পরের সহযোগিতার ওপরও তার অস্তিত্ব নির্ভরশীল। জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ব এবং অন্যের দুঃখ উপলব্ধি করার ক্ষমতা মানবিক চেতনার গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
প্রাণের সঙ্গে জীবন, অনুভূতি ও কর্মের সম্পর্ক রয়েছে। জীবদেহের মৃত্যু হলে তার জৈবিক অস্তিত্বের অবসান ঘটে এবং দেহ প্রকৃতির উপাদানে ফিরে যায়। কিন্তু মানুষ তার কর্ম, চিন্তা, আবিষ্কার ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে স্মৃতি ও প্রভাব রেখে যেতে পারে। এই উপলব্ধি আমাদের শেখায়, জীবনকে অর্থবহ করে তোলার জন্য শুধু নিজের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবলেই চলে না; অন্যের জীবনে আমরা কী অবদান রাখছি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বেদ, উপনিষদ, পুরাণ ও ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন ধারায় ঈশ্বর, আত্মা, চেতনা এবং জগতের সম্পর্ক নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। এসব চিন্তার মধ্যে যেমন মিল আছে, তেমনি মতভেদও আছে। কোনো দর্শন পরমসত্তার একত্বকে গুরুত্ব দেয়, কোনোটি সৃষ্টির বহুরূপী প্রকাশ ব্যাখ্যা করে, আবার কোনো দার্শনিক ধারা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে কেন্দ্র না করেও জীবন ও জগতের ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করে। এই মতবৈচিত্র্যকে স্বীকার করাই জ্ঞানচর্চার পরিসরকে বড় করে।
পৃথিবীর মানুষ ধর্ম, জাতি ও সম্প্রদায়ের পরিচয়ে বিভক্ত হলেও মানবিক প্রয়োজনের জায়গায় অনেক মিল রয়েছে। সবাই নিরাপত্তা, মর্যাদা, ভালোবাসা ও শান্তি চায়। পরিচয় মানুষের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করতে পারে, কিন্তু সেই পরিচয় যদি অন্যকে ছোট করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে তা মানবিকতার পরিপন্থী। নিজের বিশ্বাসে অবিচল থাকার পাশাপাশি অন্যের বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের অধিকারকে সম্মান করাও সভ্যতার অপরিহার্য শর্ত।
মানুষ প্রশ্ন করতে শেখার মধ্য দিয়ে জ্ঞানের নতুন দুয়ার খুলেছে। আমি কে? আমার অস্তিত্বের অর্থ কী? কোথা থেকে এসেছি? কোথায় যাব? জীবনের দায়িত্ব কী?—এসব প্রশ্নের উত্তর এক বাক্যে দেওয়া সম্ভব নয়। বিজ্ঞান কিছু প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করে পরীক্ষণ ও প্রমাণের মাধ্যমে, দর্শন যুক্তি ও বিশ্লেষণের সাহায্যে, আর ধর্মীয় বিশ্বাস অনেকের কাছে জীবনের অর্থ ও নৈতিকতার পথনির্দেশ দেয়। পদ্ধতি আলাদা হলেও মানুষের অনুসন্ধিৎসা এসব ক্ষেত্রকে যুগে যুগে প্রভাবিত করেছে।
তাই প্রশ্ন করা মানেই অবিশ্বাসী হওয়া নয়, আবার বিশ্বাসী হওয়া মানেই সব প্রশ্নের উত্তর জানা নয়। প্রকৃত জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যিনি নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেন, নতুন তথ্য থেকে শেখেন এবং মতভিন্নতার মধ্যেও যুক্তির জায়গা ধরে রাখেন। আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে নিজের ভুল বুঝতে সাহায্য করে, অন্যের প্রতি সহনশীল করে এবং জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়।
নিজেকে জানার আহ্বান তাই কেবল ব্যক্তিগত উপলব্ধির বিষয় নয়; এটি মানবিক সমাজ গঠনেরও একটি পথ। নিজের চিন্তা ও আচরণকে যাচাই করা, অন্যের কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সত্যের অনুসন্ধানে সৎ থাকা—এসবের মধ্য দিয়েই মানুষ তার মনুষ্যত্বকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
“Know thyself”—নিজেকে জানো। এই প্রাচীন দার্শনিক আহ্বান আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জগতের রহস্য অনুসন্ধানের পাশাপাশি নিজের মন, বিবেক ও দায়িত্বকেও চিনতে হবে।
শারদীয় দুর্গোৎসব আমাদের জীবনে শুভবোধ, সহমর্মিতা ও সৃজনশীলতার আলো ছড়িয়ে দিক। ধর্মীয় আচার হোক অন্তরের পরিশুদ্ধির অনুপ্রেরণা, আর জ্ঞানচর্চা হোক মুক্ত ও মানবিক চিন্তার ভিত্তি। শারদীয় দুর্গোৎসবে সবার জীবনে শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণের প্রত্যাশা।




