শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন আজ বিজয়া দশমী। আনন্দের উৎসব শেষে বিদায়ের বিষাদে ভারী হয়ে ওঠে ভক্তের হৃদয়। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, ধূপের সুবাস আর মায়ের আরাধনায় মুখর মণ্ডপগুলোতে আজ বেজে ওঠে বিদায়ের সুর। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু বিজয়া দশমীর তাৎপর্য প্রতিমা বিসর্জন কিংবা উৎসবের সমাপ্তিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা মানুষের চিন্তা, বিবেক ও জীবনাচরণকে আলোকিত করার মধ্যেই নিহিত।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধ অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীক। এই পৌরাণিক আখ্যান মানুষের সামনে এক চিরন্তন সত্য তুলে ধরে—অন্যায় যত শক্তিশালীই হোক, তার বিরুদ্ধে ন্যায়, সাহস ও সত্যের সংগ্রাম থেমে থাকা উচিত নয়। দেবী দুর্গার শক্তি তাই কেবল পূজার মণ্ডপে আরাধনার বিষয় নয়; অন্যায়, শোষণ, হিংসা ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রেরণাও।
বিজয়া দশমী আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার সুযোগ করে দেয়। যে অশুভ শক্তির বিনাশ কামনায় আমরা দেবীর কাছে প্রার্থনা করি, সেই অশুভের কোনো ছায়া কি আমাদের নিজেদের চিন্তা ও আচরণে রয়ে গেছে? অন্যের প্রতি বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা, অহংকার, বৈষম্য কিংবা দুর্বলের প্রতি অবিচার থেকে মুক্ত হতে না পারলে পূজার প্রকৃত শিক্ষা কতটা ধারণ করা সম্ভব? এই প্রশ্নগুলোই বিজয়ার চেতনাকে অর্থবহ করে তোলে।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা সন্তানদের নিয়ে কৈলাসে ফিরে যান এই দিনে। তাই মাকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে ভক্তদের চোখে জল আসে, কণ্ঠে উচ্চারিত হয়—‘মা, আবার এসো।’ এই আকুতির মধ্যে রয়েছে বিচ্ছেদের বেদনা, আবার ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা। প্রতিমা বিসর্জিত হয়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে দেবীর শক্তি, সাহস ও মঙ্গলময়তার যে আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা, তা যেন বিসর্জিত না হয়।
বিজয়া দশমীর সামাজিক তাৎপর্যও গভীর। বিজয়ার প্রণাম, আশীর্বাদ, শুভেচ্ছা বিনিময় ও মিষ্টিমুখের মধ্য দিয়ে মানুষ পরস্পরের কাছে আসে। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো অভিমান ভুলে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়। বিভিন্ন মণ্ডপে সিঁদুর খেলার ঐতিহ্যও আনন্দ, মঙ্গলকামনা ও পারস্পরিক বন্ধনের প্রকাশ। এসব আয়োজনের মূল সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন উৎসবের আনন্দ ব্যক্তিগত পরিসর ছাড়িয়ে সমাজের সব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজে বিজয়া দশমী সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বার্তাও বহন করে। ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা, অধিকার ও শান্তিতে বসবাসের আকাঙ্ক্ষা অভিন্ন। তাই উৎসবের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া, অন্যের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সচেতন অবস্থান নেওয়া আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।
দেবী দুর্গার আরাধনার প্রকৃত সার্থকতা নিহিত রয়েছে মানবিক মূল্যবোধের চর্চায়। শক্তি যেন দুর্বলকে দমনের হাতিয়ার না হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সাহস জোগায়; বিশ্বাস যেন বিভেদের দেয়াল না তুলে মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও সহমর্মিতার বন্ধন গড়ে তোলে। সত্য, ন্যায় ও মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই বিজয়া দশমীর শিক্ষা জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে।
আজ বিদায়ের ক্ষণে আমাদের প্রার্থনা হোক—মানুষের মন থেকে দূর হোক হিংসা, বিদ্বেষ ও সংকীর্ণতা। সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক ন্যায়বিচার, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা। প্রতিটি মানুষ যেন নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং শান্তিতে বেঁচে থাকার সুযোগ পায়।
মা দুর্গা আবার আসবেন নতুন শরতে। তার আগ পর্যন্ত তাঁর শক্তি ও শুভবোধের শিক্ষা আমাদের প্রতিদিনের কাজে, সিদ্ধান্তে ও আচরণে প্রতিফলিত হোক। অশুভের বিনাশ এবং শুভের প্রতিষ্ঠা ঘটুক মানুষের মননে ও সমাজজীবনে। শুভ বিজয়া দশমী।




