আজ বিজয়া দশমী। শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিনে আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে বিদায়ের বিষাদ। কয়েক দিনের পূজা, প্রার্থনা ও উৎসবের পর দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাবেন ভক্তরা। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক আয়োজন। কিন্তু যে বিশ্বাস, শক্তি ও শুভবোধকে ধারণ করে দেবীর আরাধনা, তা যেন উৎসবের সঙ্গে শেষ হয়ে না যায়। বিজয়া দশমীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান এখানেই—প্রতিমার বিদায় হোক, কিন্তু আদর্শের নয়।
দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধ সনাতন ধর্মের এক তাৎপর্যপূর্ণ আখ্যান। এর মধ্য দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়, অশুভের বিরুদ্ধে শুভ এবং অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর বিজয়কে প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়। এই কাহিনি আমাদের শেখায়, অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ নয়, বরং সাহস ও নৈতিক শক্তি নিয়ে তার মোকাবিলা করাই সত্যিকারের বিজয়।
তবে অশুভ শক্তিকে কেবল পৌরাণিক কাহিনি কিংবা বাইরের কোনো প্রতিপক্ষের মধ্যে খুঁজলে চলবে না। মানুষের লোভ, অহংকার, হিংসা, অসহিষ্ণুতা ও অন্যের অধিকার অস্বীকার করার প্রবণতাও সমাজের অকল্যাণ ডেকে আনে। বিজয়া দশমী তাই নিজের ভেতরের দুর্বলতা ও নেতিবাচক প্রবণতাকে চিহ্নিত করারও দিন। অন্যকে পরিবর্তনের আহ্বান জানানোর আগে নিজের আচরণে ন্যায়, সততা ও মানবিকতার প্রতিফলন ঘটানো জরুরি।
প্রচলিত বিশ্বাসে, বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গা সন্তানদের নিয়ে কৈলাসে ফিরে যান। মাকে বিদায় জানানোর সময় ভক্তদের কণ্ঠে শোনা যায় আগামী বছর আবার ফিরে আসার আকুতি। এই বিদায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের আনন্দময় মুহূর্ত স্থায়ী না হলেও তার শিক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। উৎসবের কয়েকটি দিন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু সেই উৎসব আমাদের মধ্যে কী পরিবর্তন আনল, তার মূল্যায়নই গুরুত্বপূর্ণ।
বিজয়া দশমীর আরেকটি তাৎপর্য হলো সম্পর্কের পুনর্নির্মাণ। বড়দের প্রণাম, ছোটদের আশীর্বাদ, স্বজনদের শুভেচ্ছা বিনিময় এবং মিষ্টিমুখের মধ্য দিয়ে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় হয়। সিঁদুর খেলার মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজন অনেক স্থানে উৎসবের আনন্দকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। কিন্তু সম্পর্কের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু আনুষ্ঠানিকতায় নয়; মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, ভুল ক্ষমা করা এবং বিপদের সময়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মধ্যেও তা প্রকাশ পায়।
আমাদের সমাজে ধর্মীয় উৎসবের একটি বড় শক্তি হলো মানুষকে একত্র করার সামর্থ্য। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করেন। এই বৈচিত্র্যকে বিরোধের কারণ না করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। অন্যের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান, সংখ্যালঘু ও দুর্বল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টাই সম্প্রীতির বাস্তব রূপ।
দুর্গোৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা মানুষের কল্যাণে ভূমিকা রাখে। ক্ষুধার্তের পাশে দাঁড়ানো, অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকা—এসব কাজের মধ্য দিয়েই শুভশক্তির চর্চা সম্ভব। ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে মানবিক দায়িত্বের এই সংযোগই উৎসবকে দেয় গভীর সামাজিক তাৎপর্য।
আজ প্রতিমা বিসর্জনের ক্ষণে আমাদের অঙ্গীকার হোক, ব্যক্তিজীবনে সততা, সমাজজীবনে সহনশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায়বিচারের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় আমরা সচেষ্ট থাকব। বিদ্বেষ নয়, ভালোবাসা; প্রতিহিংসা নয়, ক্ষমাশীলতা; বিভেদ নয়, সহাবস্থান—এই হোক বিজয়ার শিক্ষা।
দেবী দুর্গা আবার আসবেন নতুন শরতে। সেই প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকুক মানুষের হৃদয়, আর তাঁর আদর্শের চর্চা চলুক প্রতিদিন। অশুভের বিনাশ কেবল প্রার্থনায় নয়, মানুষের বিবেক ও কর্মে বাস্তব হয়ে উঠুক। েশুভ বিজয়া দশমী। সবার জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি, মর্যাদা ও মানবিকতার আলো।




