প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইনে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, তল্লাশি, ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ ও নজরদারির আগে আদালতের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে সম্পাদক পরিষদ। জরুরি পরিস্থিতিতে সংবাদ বা ডিজিটাল কনটেন্ট ব্লক করা হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিচারিক পর্যালোচনা নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকদের তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা রক্ষাসহ ১২ দফা সুপারিশ দিয়েছে সংগঠনটি।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর ও সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সই করা বিবৃতিতে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলো তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর কাছে পৌঁছানোর জন্য প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদের দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়।
সম্পাদক পরিষদ বলেছে, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর আইন প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে স্বাধীন সাংবাদিকতা, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ এবং বৈধ মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত রাখতে হবে। প্রস্তাবিত আইন চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
সুপারিশে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে প্রকাশিত সংবাদ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ ও মতামতকে শুধু বিষয়বস্তু বা সমালোচনামূলক অবস্থানের কারণে সাইবার অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। রাজনৈতিক সমালোচনা, রম্য, কার্টুন, প্যারোডি, ভোক্তার অভিযোগ কিংবা অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য কাউকে অপরাধী না করার কথাও বলা হয়েছে। মতপ্রকাশসংক্রান্ত অপরাধ জামিনযোগ্য রাখার সুপারিশ করেছে পরিষদ।
সাংবাদিকতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত অভিযোগে গ্রেপ্তার, তল্লাশি, ডিভাইস জব্দ ও নজরদারির আগে আদালতের অনুমতি নেওয়ার পাশাপাশি জরুরি ক্ষেত্রে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিচারিক অনুমোদন বা পর্যালোচনার ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ভুল তথ্য, অপতথ্য ও গুজবের পৃথক সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং বুলিং, মানহানি ও যৌন হয়রানির মতো অপরাধের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, পরিবেশগত ক্ষতি, জনস্বাস্থ্য, ভোক্তা অধিকার ও সরকারি ব্যয় নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার আইনি সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধির সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করা এবং ‘রাষ্ট্রকে হেয়প্রতিপন্ন করা’র মতো অস্পষ্ট শব্দবন্ধ বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অনলাইন কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি, লিখিত কারণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ এবং আপিলের ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব দিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। অনলাইনে মানহানির অভিযোগ প্রেস কাউন্সিলে পাঠানো, সংবাদ প্রকাশের জন্য মোবাইল কোর্ট বা নির্বাহী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিচার না করা এবং একটি প্রতিবেদনের কারণে পুরো সংবাদমাধ্যম বন্ধ বা নিবন্ধন বাতিল না করার সুপারিশও রয়েছে।
এ ছাড়া সাংবাদিকের তথ্যসূত্রের পরিচয় প্রকাশে বাধ্য না করা, পেশাগত আচরণসংক্রান্ত বিরোধে উপযুক্ত ক্ষেত্রে আগে প্রেস কাউন্সিলের প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রেস কাউন্সিল আধুনিকায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলে সাইবার নিরাপত্তা, আইন, মানবাধিকার ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করে স্বাধীন তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
এদিকে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, এ ধরনের ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জনগণের জানার অধিকারের ওপর আঘাত। হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি নিহত সাংবাদিক আগে কোনো হুমকি পেয়েছিলেন কি না এবং এর পেছনে রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত বা সাংবাদিকতাসংশ্লিষ্ট বিরোধ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছে পরিষদ।