ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ১৩ অক্টোবর বিশ্ব হারিয়েছে বহু গুণী মানুষকে। রাজনীতি, সাহিত্য, শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও সমাজসংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এসব ব্যক্তিত্বের কর্ম আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, সংগীতশিল্পী, নাট্যকার ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যুক্ত ব্যক্তিরা।
উল্লেখযোগ্য মৃত্যু
৫৪ খ্রিষ্টাব্দ: রোমান সাম্রাজ্যের চতুর্থ সম্রাট ক্লডিয়াসের মৃত্যু হয়। ৪১ থেকে ৫৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তার শাসনামলে সাম্রাজ্যের বিস্তার ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে পরিবর্তন আসে।
১৮২২: ইতালীয় ভাস্কর আন্তোনিও কানোভা মারা যান। নব্য ধ্রুপদি শিল্পধারার অন্যতম প্রধান এই শিল্পী মার্বেলের ভাস্কর্যে অসাধারণ নৈপুণ্যের পরিচয় দেন।
১৮৮২: ফরাসি দার্শনিক ও কূটনীতিক জোসেফ আর্থার দ্য গোবিনোর মৃত্যু হয়। জাতি ও সভ্যতা নিয়ে তার বিতর্কিত তত্ত্ব পরবর্তী সময়ে বর্ণবাদী চিন্তার ইতিহাসে আলোচিত হয়।
১৯০৯: স্পেনের মুক্তচিন্তক ও শিক্ষাসংস্কারক ফ্রান্সিসকো ফেরার ই গুয়ার্দিয়া মৃত্যুবরণ করেন। যুক্তিনির্ভর ও মুক্ত শিক্ষার পক্ষে অবস্থানের জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন।
১৯১১: ভগিনী নিবেদিতা, যার প্রকৃত নাম মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল, মারা যান। স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা হিসেবে নারীশিক্ষা, সমাজসেবা ও ভারতীয় সংস্কৃতির বিকাশে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯১৯: ডেনমার্কের কবি ও ঔপন্যাসিক কার্ল অ্যাডলফ গেজেলরুপের মৃত্যু হয়। ১৯১৭ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
১৯৬৪: একই দিনে প্রয়াত হন বাংলা সাহিত্যের কথাশিল্পী, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রেমাঙ্কুর আতর্থী এবং কবি গোলাম মোস্তফা। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাদের অবদান স্মরণীয়।
১৯৭১: পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর আবদুল মোনেম খানের মৃত্যু হয়। পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি ছিলেন আলোচিত ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব।
১৯৮৩: বাংলা মঞ্চনাটকের বিশিষ্ট অভিনেতা, নাট্যকার ও নির্দেশক অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় মারা যান। বাংলা থিয়েটারের বিকাশে তার অবদান উল্লেখযোগ্য।
১৯৮৭: জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও অভিনেতা কিশোর কুমারের মৃত্যু হয়। বাংলা ও হিন্দি গানে স্বতন্ত্র কণ্ঠ এবং অভিনয়শৈলীর জন্য তিনি উপমহাদেশজুড়ে জনপ্রিয় ছিলেন। একই দিনে মারা যান বাংলাদেশের যাত্রাশিল্পের বিশিষ্ট অভিনেতা ও পরিচালক অমলেন্দু বিশ্বাস এবং ট্রানজিস্টর উদ্ভাবনে অবদান রাখা মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী ওয়াল্টার হাউজার ব্র্যাটেইন। ব্র্যাটেইন ১৯৫৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
১৯৯০: ভিয়েতনামের বিপ্লবী ও কূটনীতিক লি ডাক থো মৃত্যুবরণ করেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে প্যারিস শান্তি আলোচনায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯৭৩ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি।
২০০২: কৃষক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেত্রী ইলা মিত্র মারা যান। তেভাগা আন্দোলনে তার ভূমিকা এবং কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তাকে উপমহাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে।
২০০৩: কানাডীয় পদার্থবিজ্ঞানী বারট্রাম ব্রকহাউসের মৃত্যু হয়। নিউট্রন বিক্ষেপণবিষয়ক গবেষণার জন্য তিনি ১৯৯৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
২০০৪: প্রয়াত হন ব্রিটিশ লেখিকা বার্নিস রুবেনস ও ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেত্রী নিরূপা রায়। রুবেনস ১৯৭০ সালে ‘দ্য ইলেকটেড মেম্বার’ উপন্যাসের জন্য বুকার পুরস্কার পান। নিরূপা রায় ভারতীয় চলচ্চিত্রে বিশেষত মায়ের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য পরিচিত ছিলেন।
২০০৬: বাংলা সাহিত্যের ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও প্রাবন্ধিক প্রতিভা বসু মারা যান। মানবসম্পর্ক ও পারিবারিক জীবনের নানা দিক তাঁর লেখায় উঠে এসেছে।
২০০৭: বাংলাদেশের সাংবাদিক ও লেখক ওবায়েদ উল হকের মৃত্যু হয়। সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় তার অবদান স্মরণীয়।
২০১৩: বাঙালি সাহিত্যিক চিত্তরঞ্জন মাইতি মৃত্যুবরণ করেন। বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অবদান পাঠকমহলে পরিচিত।
২০১৬: থাইল্যান্ডের দীর্ঘকালীন রাজা ভূমিবল অতুল্যতেজের মৃত্যু হয়। ১৯৪৬ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সিংহাসনে থাকা এই রাজা দেশটির রাজনীতি ও সমাজজীবনে ব্যাপক প্রভাব রেখেছিলেন। একই দিনে মারা যান ইতালীয় নাট্যকার, অভিনেতা ও মঞ্চপরিচালক দারিও ফো। রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও সামাজিক অসংগতি তুলে ধরার জন্য পরিচিত ফো ১৯৯৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান।
২০২০: বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক রশীদ হায়দার মারা যান। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ ও সাহিত্যচর্চায় তার উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তিনি একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন।
২০২৩: মার্কিন কবি ও প্রাবন্ধিক লুইজ গ্লিকের মৃত্যু হয়। আধুনিক কবিতায় নিঃসঙ্গতা, প্রকৃতি ও মানবজীবনের জটিলতা তুলে ধরার জন্য পরিচিত এই কবি ২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
স্মরণে ১৩ অক্টোবর
ইতিহাসের এই দিনে প্রয়াত ব্যক্তিত্বদের জীবন ও কর্ম স্মরণ করিয়ে দেয়, মানুষের অবদান তার জীবদ্দশায় সীমাবদ্ধ থাকে না। সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, রাজনীতি কিংবা অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের সৃষ্টি ও চিন্তা পরবর্তী প্রজন্মকে প্রভাবিত করে। সময়ের সঙ্গে মানুষ হারিয়ে গেলেও তাঁদের কর্ম ইতিহাসের পাতায় অমলিন থাকে।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া।