অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী প্রচার, কথিত অবৈধ অর্থায়ন ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ মামলায় গ্রেপ্তার লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) বিজয় দেবাশীষ নারায়ণ পাল ও লেফটেন্যান্ট (অব.) কাজী গুলশান আরাকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।
রোববার রাতে রাজধানীর পল্লবী ও বনানী ডিওএইচএস এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার আদালতে হাজির করে পুলিশ সাত দিনের রিমান্ড চাইলে শুনানি শেষে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক কনটেন্ট ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। গ্রুপ দুটি হলো ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাপোর্টার্স আলফা নম্বর ১’ ও ‘বিবিএম ট্রান্সপারেন্সি’। এসব গ্রুপে কারা যুক্ত ছিলেন, অর্থ সংগ্রহ হয়ে থাকলে তা কোথা থেকে এসেছে এবং কী কাজে ব্যয় হয়েছে, তা জানতে চায় পুলিশ।
মামলার নথিতে ‘ইউনিটি কেয়ার’ ও ‘পাবলিক পার্লামেন্ট’ নামে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের দুটি প্ল্যাটফর্মের কথাও এসেছে। পুলিশের অভিযোগ, এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়েছিল। এর মাধ্যমে দলটিকে পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা চালানোর অভিযোগও আনা হয়েছে। তবে এসব যোগাযোগের সঙ্গে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তে যাচাই করতে হবে।
অনলাইন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ‘কালআজকাল ডটকম’ নামের একটি ফেসবুক পেজ এবং কাজী গুলশান আরার নামে থাকা একটি অ্যাকাউন্টের উল্লেখ করেছে পুলিশ। এসব মাধ্যমে সহিংসতায় উসকানি বা অস্থিতিশীলতা তৈরির মতো কনটেন্ট প্রচারের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট কারা পরিচালনা করতেন এবং ডিজিটাল কার্যক্রমে অন্য কেউ যুক্ত ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের রিমান্ড আবেদনে ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধিদলের সাক্ষাতের প্রসঙ্গও উল্লেখ করা হয়েছে। ওই দলে কাজী গুলশান আরার উপস্থিতি এবং পরে ‘বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদ’ নামে একটি কমিটি গঠনের বিষয়ে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। অতীতের রাজনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি বর্তমান মামলার অভিযোগের সঙ্গে এর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও যাচাইয়ের বিষয়।
পল্লবী থানায় দায়ের করা মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ১০১ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি করেছেন ডিবির পল্লবী জোনাল টিমের পুলিশ পরিদর্শক আলী আকবর। এতে দণ্ডবিধি, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার সুরক্ষাসংক্রান্ত আইনের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
রিমান্ড শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা পুলিশের বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। কাজী গুলশান আরার আইনজীবী মোহাম্মদ মশিউর রহমানের দাবি, তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য ও প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। দেবাশীষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মনসুরও অভিযোগের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, আসামিদের রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদের সঙ্গে কথিত যোগাযোগের বিষয়ে তদন্ত প্রয়োজন।
তদন্তে এখন মূলত অর্থায়নের উৎস, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও ফেসবুক পেজের কার্যক্রম, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং কথিত রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রকৃতি নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। তবে গ্রেপ্তার বা রিমান্ডে থাকা মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।