সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওহিদুজ্জামান শামীম হত্যা মামলায় ফজলুল হক আমিনী গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক মব হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের মধ্যে রয়েছেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, এক ইউপি সদস্যের স্বামী ও স্থানীয় বাসিন্দা। তাদের অভিযোগ, ধর্ম অবমাননার কথা ছড়িয়ে হামলা, মারধর, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এবং লুটপাট চালানো হয়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে ৭৭ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম স্ত্রীকে নিয়ে ভারতে চলে গেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মঙ্গলবার দেবহাটার পারুলিয়া ইউনিয়নের ফুলবাড়িয়া গ্রামে শহিদুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। বাড়ির ফটকে তালা ঝুলছে। একসময় ‘বীর নিবাস’ হিসেবে পরিচিত পাকা বাড়িটি এখন লতাপাতা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে। প্রতিবেশীদের ভাষ্য, ২০২৫ সালের ১৫ মে পারুলিয়া মাছবাজারে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে শহিদুল ইসলামকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়। পরে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। একটি পুরোনো মামলায় প্রায় চার মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেলেও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তিনি দেশ ছাড়েন বলে দাবি স্থানীয়দের।
শহিদুল ইসলামের প্রতিবেশী হাফিজুর রহমান বলেন, এলাকায় তিনি ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে তাকে মারধর করা হয়। এরপর বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ায় সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। শহিদুল ইসলামের মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ হাবিবুল বাসার বলেন, ১৯৭১ সালে তারা একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়ে শহিদুলের দেশ ছাড়ার ঘটনা দুঃখজনক।
দেবহাটার কোমরপুর গ্রামে পারুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত ওয়ার্ডের এক নারী সদস্যের স্বামী কুতুব উদ্দীন কাদেরীর বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও উঠেছে আমিনী ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। কুতুব উদ্দীনের স্ত্রী নুরবানু কাদেরীর দাবি, ২০২৫ সালের ৪ ও ৫ অক্টোবর দুই দফায় তাদের বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগ তুলে এ হামলা চালানো হয়েছিল বলে তিনি জানান। তার পানির প্রকল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট এবং দোতলা বাড়িতে ভাঙচুর করা হয়। এতে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
নুরবানুর অভিযোগ, হামলার ঘটনায় প্রতিকার না পেয়ে উল্টো তার স্বামীকে নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। কুতুব উদ্দীন আওয়ামী লীগ সমর্থক হওয়ায় তাকে হয়রানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরিবারটি এখনও আতঙ্কে রয়েছে বলে জানান নুরবানু।
এ ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যে কুলিয়া ইউনিয়নের পুষ্পকাটি গ্রামে আওয়ামী লীগ সমর্থক সোহাগ হোসেনের বাড়িতেও হামলার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, ধর্মের শত্রু আখ্যা দিয়ে আমিনীর নেতৃত্বে শতাধিক লোক সেখানে জড়ো হন। সোহাগকে মারধর এবং তার বাড়িতে লুটপাট চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সোহাগ জানান, হামলার পর থেকে তিনি অসুস্থ এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে আইনি সহায়তা নিতে সাহস পাননি।
পারুলিয়া বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমিনী গ্রেপ্তার হলেও এলাকায় আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মুক্তির দাবিতে প্রচার চালানো হচ্ছে বলেও তারা জানান।
সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম বলেন, শামীম হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিসেবে আমিনীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অতীতের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কেউ আইনি সহায়তা চাইলে পুলিশ সহযোগিতা করবে। থানায় অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত ১৩ অক্টোবর দেবহাটার বড়শান্তা গ্রামে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ওহিদুজ্জামান শামীমকে তিন দফায় মারধর করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচার করে লোকজন জড়ো করার পর সখিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন শামীমের ওপর হামলা চালানো হয়। পরে পুলিশ তাকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহতের ভাই আব্দুল কুদ্দুস বাদী হয়ে আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখসহ ২৫০ জনের বিরুদ্ধে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলা করেন। পুলিশ জানিয়েছে, মামলায় আমিনী আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তার সহযোগীদের শনাক্ত করতে ভিডিও ও ছবি যাচাই করা হচ্ছে।