বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামে তালাককে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে শরিয়ত নির্ধারিত নিয়মে বিচ্ছেদের সুযোগ রয়েছে। তবে আবেগ, রাগ কিংবা নিছক মজার বশে তালাকের শব্দ ব্যবহার করলেও এর ধর্মীয় পরিণতি হতে পারে।
এ বিষয়ে অনেকের মধ্যেই ভুল ধারণা রয়েছে। বিশেষ করে কেউ কেউ মনে করেন, হাসি-ঠাট্টার সময় তালাকের কথা বললে তা কার্যকর হয় না। কিন্তু ইসলামী শরিয়তের প্রচলিত ফিকহি ব্যাখ্যায় বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখা হয়েছে।
একজন নারী জানতে চেয়েছেন, তার স্বামী একদিন মজা করে পরপর দুবার তালাক শব্দ উচ্চারণ করেন। এরপরও তারা স্বাভাবিকভাবে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলে স্বামী দাবি করেন, শুধু তালাক বললেই কোনো কিছু ঘটে না। এ অবস্থায় তাদের বৈবাহিক সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা কী, তা নিয়ে ওই নারীর মনে সংশয় তৈরি হয়েছে।
আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তালাক, বিবাহ ও রুজু—এই তিনটি বিষয়ে ঠাট্টার ছলেও উচ্চারিত বক্তব্যের শরিয়তগত প্রভাব রয়েছে। এ প্রসঙ্গে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি হাদিস উল্লেখ করা হয়। সুনানে তিরমিজির ১১৮৪ নম্বর হাদিসে বিবাহ, তালাক ও রুজুকে এমন তিনটি বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো গুরুত্ব দিয়ে বলার পাশাপাশি রসিকতা করে বললেও কার্যকর হয়।
ইসলামী আইনবিদ আলাউদ্দিন কাসানী (রহ.)-এর ব্যাখ্যাতেও ঠাট্টাচ্ছলে তালাক উচ্চারণের বিষয়টি কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
উল্লিখিত প্রশ্নের শরিয়তভিত্তিক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, স্বামীর পরপর দুইবার তালাক উচ্চারণের কারণে দুই তালাকে রজয়ী কার্যকর হয়েছে। তবে এ ধরনের তালাকের পর নির্ধারিত ইদ্দতকালের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পুনর্বহালের সুযোগ থাকে। স্বামী মুখে রুজু করার পাশাপাশি দাম্পত্য সম্পর্কের নির্দিষ্ট আচরণের মাধ্যমেও রুজু করতে পারেন বলে ফিকহি ব্যাখ্যায় উল্লেখ রয়েছে।
তাবেয়ি ইবরাহিম নাখাঈ (রহ.)-এর মতে, ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস রুজু হিসেবে বিবেচিত হয়। একইভাবে আলাউদ্দিন কাসানী (রহ.) কামভাবসহ স্ত্রীর শরীর স্পর্শ করাকেও রুজুর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
অর্থাৎ, প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতিতে ইদ্দত চলাকালে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সহবাস কিংবা রুজু হিসেবে গণ্য হয় এমন আচরণ ঘটে থাকলে তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকার বিষয়টি বিবেচনায় আসবে।
তবে দুই তালাক কার্যকর হয়ে থাকলে পরবর্তী সময়ে স্বামীর হাতে আর মাত্র এক তালাকের অধিকার অবশিষ্ট থাকে—উল্লিখিত ফিকহি ব্যাখ্যায় এমনটাই বলা হয়েছে। তৃতীয় তালাক কার্যকর হলে স্বাভাবিক নিয়মে আগের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পুনরায় দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ থাকে না।
এ কারণে তালাকের শব্দ নিয়ে কৌতুক করা কিংবা হালকাভাবে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন আলেমরা। এ বিষয়ে সতর্কবার্তা হিসেবে মাজমাউয যাওয়ায়েদের ৭৭৬৫ নম্বর হাদিসেও বিবাহ, তালাক ও দাসমুক্তির মতো বিষয় নিয়ে রসিকতা না করার কথা উল্লেখ রয়েছে।