বিদেশে ডেটা এন্ট্রির চাকরি করে ভালো আয় করার আশায় কম্বোডিয়ায় গিয়েছিলেন তোফায়েল আহমেদ। এ জন্য বাংলাদেশে দালালদের দিয়েছিলেন ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু দেশটিতে পৌঁছানোর পর তার অভিযোগ, তাকে একটি চীনা প্রতারক চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখানে অনলাইনে প্রতারণামূলক কাজে বাধ্য করা এবং নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। প্রায় দুই মাসের দুর্ভোগের পর পালিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরেছেন তোফায়েল।
কম্বোডিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটি থেকে ৯৬টি দেশের ৭২ হাজার ৪২৬ জন বিদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি ৩ হাজার ৩৬৪ জন। কম্বোডিয়া কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এদের ৮৫২ জন অনলাইনে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তবে ফেরত পাঠানো বাংলাদেশিদের মধ্যে কতজন পাচারের শিকার হয়ে জোরপূর্বক এসব কাজে যুক্ত হয়েছিলেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যের বরাতে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৫ হাজার ৯৬৩ বাংলাদেশি কম্বোডিয়ায় কাজের অনুমতি বা ক্লিয়ারেন্স নিয়েছেন। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত কম্বোডিয়া থেকে ৫৮৩ বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০৯ জনকে স্ক্যাম সেন্টার থেকে উদ্ধার করা হয়।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান এ ধরনের জবরদস্তিমূলক কাজকে ‘সাইবার দাসত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কম্পিউটার অপারেটর, ডেটা এন্ট্রি কর্মী ও কাস্টমার সার্ভিসের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অনেক বাংলাদেশিকে কম্বোডিয়ায় নেওয়া হয়েছে। মাসে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার বেশি বেতনের আশ্বাস দিয়ে কারও কারও কাছ থেকে দুই থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। পরে তাদের আটকে রেখে অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।
তোফায়েলের বর্ণনা অনুযায়ী, বিএমইটির স্মার্ট কার্ড পাওয়ার পর গত ৩০ এপ্রিল তিনি কম্বোডিয়ায় যান। ডেটা এন্ট্রির কাজের কথা বলা হলেও তার নিয়োগসংক্রান্ত আমন্ত্রণপত্রে নির্মাণকাজের উল্লেখ ছিল। সেখানে পৌঁছানোর তিন দিন পর তাকে রাতে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরের একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, তাকে অনলাইন প্রতারণার কাজে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
তোফায়েল জানান, ইংরেজি ভাষা, টাইপিং এবং মানুষকে বিনিয়োগে আগ্রহী করার দক্ষতা যাচাইয়ের পর তাকে কাজ করতে বলা হয়। তিনি রাজি না হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে বাধ্য করেন বলে অভিযোগ করেন। তার দাবি, প্রায় দুই হাজার ডলারের বিনিময়ে তাকে ওই চক্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং মুক্তি পেতে ওই অর্থ পরিশোধের কথা বলা হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এক মাস ২৭ দিন ওই স্থানে থাকার সময় কাজের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। বৈদ্যুতিক শক দেওয়া এবং খাবার না দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।
তোফায়েল জানান, পাসপোর্ট ফেরত পাওয়ার জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার অজুহাত দেন তিনি। পরে এক রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। তার দাবি, প্রায় ১১ ফুট উঁচু দেয়াল টপকে বের হওয়ার সময় আহত হন। এরপর খালি পায়ে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দৌড়ে একটি গাছের নিচে আশ্রয় নেন।
পালানোর পরও বিপদ কাটেনি। তার অভিযোগ, দালালদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এক বছরের ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট পাননি। পরে থাইল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের উদ্যোগে ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ জরিমানা মওকুফের সুযোগের কথা জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন। টিকিটের ব্যবস্থা করে ২০২৬ সালের ১৪ জুন দেশে ফেরেন। দেশে ফিরে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা তাকে সহায়তা দিতে শুরু করে।
এদিকে কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফিরতে থাইল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনে ১ হাজার ৭৯৬ বাংলাদেশি সহায়তার আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে। ব্র্যাকের হিসাব অনুযায়ী, ৩০০ থেকে ৪০০ জন ফিরে এলেও আনুমানিক ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ জন তখনও ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। গত ২০ অক্টোবর আরও ৩০ বাংলাদেশি দেশে ফেরেন। কম্বোডিয়া ছাড়ার চেষ্টা করতে গিয়ে আটক হওয়ার পর বাংলাদেশ মিশনের হস্তক্ষেপে তারা মুক্তি পান।
তোফায়েল চান, তার অভিজ্ঞতা প্রচারের মাধ্যমে বিদেশে চাকরিপ্রত্যাশীরা দালালদের প্রতারণা সম্পর্কে সতর্ক হোন। তার মতে, বিশেষ করে গ্রামের সাধারণ মানুষকে বিদেশে কাজের প্রস্তাব যাচাই না করে অর্থ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে সচেতন করা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে স্পষ্ট, কম্বোডিয়ায় অনলাইন প্রতারণার সঙ্গে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের সবাই একই পরিস্থিতিতে সেখানে গেছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কেউ স্বেচ্ছায় অপরাধে যুক্ত হয়েছেন, আবার কেউ পাচার বা জবরদস্তির শিকার হয়েছেন কি না, তা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।