ভালো জীবনের আশায় সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজ নিতে গিয়ে নির্যাতন ও দুর্ভোগের মুখে পড়ছেন অনেক বাংলাদেশি নারী। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বেতনসংক্রান্ত জটিলতা, দীর্ঘ সময় কাজ করানো এবং পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়ার মতো অভিযোগ নিয়ে দেশে ফিরতে হচ্ছে তাদের। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন ৯৭৯ নারী কর্মী।
প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে দেশে ফিরেছেন ১ হাজার ৬৮৭ নারী কর্মী। তাদের মধ্যে ৫৮ দশমিক ৬২ শতাংশই সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন। তালিকায় সৌদির পর রয়েছে জর্ডান, যেখান থেকে ফিরেছেন ২২৭ জন। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৭৮, ভারত থেকে ৫২ এবং মালয়েশিয়া থেকে ৪৮ নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন।
কাজের পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ
দেশে ফিরে আসা এক নারী জানান, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজে গিয়ে তাকে দিন-রাত কাজ করতে হতো। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না, ঘুমাতে হতো রান্নাঘরে। বাসার বাইরে যাওয়ার অনুমতিও পেতেন না তিনি। পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠায় দেশে ফেরেন।
আরেক নারী অভিযোগ করেন, নিয়োগকর্তার শারীরিক নির্যাতন ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাবের মুখে পড়েছিলেন তিনি। রাজি না হলে নির্যাতন করা হতো বলে তার দাবি। দেশে ফিরে আসা আরও অনেক নারীও নির্যাতন, বেতন না পাওয়া ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশের অভিযোগ করছেন।
প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাসভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ১২৮, ফেব্রুয়ারিতে ৯৭, মার্চে ৩০, এপ্রিলে ২৩৬, মে মাসে ১৬৭, জুনে ১৬৯, জুলাইয়ে ৩৩১, আগস্টে ৩০৯ এবং সেপ্টেম্বরে ২২০ নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন। সেপ্টেম্বর মাসে শুধু সৌদি আরব থেকেই ফিরেছেন ১০৩ জন। তবে ডেস্কের হিসাবে মূলত আউটপাস নিয়ে দেশে ফেরা কর্মীদের তথ্য রয়েছে। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের ২০২৫ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাধ্য হয়ে দেশে ফেরা নারী কর্মীদের ৯৪ শতাংশ বিদেশে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৪৭ শতাংশ যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং ৮২ শতাংশকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
সৌদির ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জনের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। চলতি বছরও দেশটিতে কর্মী যাওয়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদেশে কাজের ক্ষেত্র বাড়ানো, প্রশিক্ষণ জোরদার এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা জরুরি। গৃহকর্মের পাশাপাশি তৈরি পোশাক, নির্মাণসহ অন্যান্য খাতে নারীদের কাজের সুযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা। নিরাপদ আবাসন, ন্যায্য মজুরি এবং নির্যাতনের শিকার হলে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নারী কর্মীদের আইনি সহায়তায় ১৩টি দেশে ব্যবস্থা রয়েছে। সৌদি আরবেও নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র আছে। তাদের মতে, বিদেশে কর্মসংস্থান বন্ধ না করে যাওয়ার আগে প্রশিক্ষণ, চুক্তির শর্ত সম্পর্কে ধারণা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
এদিকে, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে না জানানোর খবর প্রকাশের পর দেশটির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ। ১৮ অক্টোবর ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকেও বিষয়টি আলোচনায় আসে। নারী কর্মীদের নির্যাতনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্নটিও নতুন করে সামনে এসেছে।