একসময় তার ওপর চলচ্চিত্র নির্মাণ, চিত্রনাট্য লেখা, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা এবং বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধে থেমে যাওয়ার কথা ছিল তার সৃজনশীল পথচলা। কিন্তু সেই বাধাকেই তিনি পরিণত করেন চলচ্চিত্র নির্মাণের নতুন অভিজ্ঞতায়। তিনি ইরানের খ্যাতিমান পরিচালক জাফর পানাহি।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে স্বীকৃতি পাওয়ার পাশাপাশি নিজ দেশে একের পর এক আইনি জটিলতার মুখোমুখি হয়েছেন পানাহি। গত বছর তার নির্মিত ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’ কান চলচ্চিত্র উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বর্ণপাম জয় করে। অথচ সেই সাফল্যের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে কারাদণ্ডের মুখে পড়েছেন এই নির্মাতা।
তার আইনজীবী মোস্তফা নিলির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ অক্টোবর তেহরানের একটি আদালত পানাহিকে পাঁচ বছর এক মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। একই রায়ে তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুই বছর বিদেশ ভ্রমণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
পানাহির অনুপস্থিতিতেই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। তবে নতুন মামলায় তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কী অভিযোগ আনা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি। এর আগে ২০২৫ সালের অন্য একটি মামলায় তাকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
ছোট গল্পে বড় বাস্তবতা
১৯৯৫ সালে ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমায় যাত্রা শুরু করেন পানাহি। ছবিটির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন ইরানের আরেক প্রখ্যাত নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামি।
একটি ছোট মেয়ের সোনালি মাছ কেনার ইচ্ছাকে কেন্দ্র করে ছবিটির কাহিনি গড়ে উঠেছে। ইরানি নববর্ষের আগে মাছ কেনার জন্য মেয়েটির ছোটাছুটির মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে তেহরানের জনজীবন, মানুষের আচরণ এবং নানা সামাজিক বাস্তবতা। সাধারণ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমাজের বহুমাত্রিক চিত্র তুলে ধরার এই নির্মাণশৈলী দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা পায়। চলচ্চিত্রটি কান উৎসবে ক্যামেরা দ’অর পুরস্কার অর্জন করে।
পরবর্তী সময়ে পানাহির চলচ্চিত্রে সামাজিক বিধিনিষেধ, বৈষম্য ও নারীর অধিকার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য সার্কেল’ ছবিতে কয়েকজন নারীর জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাদের চলাচল ও সামাজিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা হয়।
এর ছয় বছর পর নির্মিত ‘অফসাইড’ ছবির বিষয় ছিল ইরানে নারীদের ফুটবল স্টেডিয়ামে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা। কয়েকজন তরুণী পুরুষের ছদ্মবেশে খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে ঢোকার চেষ্টা করে—এমন ঘটনাকে ঘিরে নির্মিত ছবিটি লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক বিধিনিষেধকে সামনে নিয়ে আসে।
২০০৬ সালে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে ‘অফসাইড’ সিলভার বেয়ার পুরস্কার লাভ করে।
পানাহির চলচ্চিত্রের বিশেষত্ব হলো, তিনি বড় কোনো ঘটনা ছাড়াই সাধারণ মানুষের জীবন থেকে সমাজের জটিল প্রশ্নগুলো তুলে আনেন। কখনো শিশুর ছোট্ট আকাঙ্ক্ষা, কখনো নারীর স্বাধীনতা, আবার কখনো দৈনন্দিন জীবনের সংকট হয়ে ওঠে তার গল্পের কেন্দ্রবিন্দু।
নিষেধাজ্ঞা ও আইনি প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও চলচ্চিত্র নির্মাণের বিকল্প পথ অনুসন্ধান করে গেছেন তিনি। তার নির্মাণযাত্রা তাই শুধু একজন পরিচালকের সাফল্য বা সংগ্রামের ইতিহাস নয়, চলচ্চিত্রের প্রকাশভঙ্গি ও সৃজনশীল স্বাধীনতা নিয়েও এক দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।