নতুন শিক্ষাবর্ষে বিনামূল্যে পাঠ্যবই ছাপানো ও সরবরাহের দরপত্র ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দরপত্রে সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ, প্রাক্কলিত মূল্য বৃদ্ধি এবং নির্দিষ্ট কিছু ছাপাখানাকে বেশি কাজ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগের কারণে সরকারের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এসব অভিযোগ তদন্তে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে নথিপত্র সংগ্রহ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই মুদ্রণ ও সরবরাহের জন্য আহ্বান করা ৪৫টি দরপত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩০টিতে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান এবং ১৩টিতে দুটি করে প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে। বাকি দুটি দরপত্রে অংশ নেয় তিনটি করে প্রতিষ্ঠান। এত কমসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানের মালিকের অনুরোধে দরপত্র চলাকালেই প্রাক্কলিত মূল্য বাড়ানো হয়। বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির এক নেতার দাবি, এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তা ও কয়েকটি ছাপাখানার মালিকের মধ্যে যোগসাজশের মাধ্যমে কাজ বণ্টন করা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
দরপত্রের মূল্য বিশ্লেষণেও বড় ধরনের বৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই মুদ্রণে প্রতি ফর্মার গড় মূল্য ছিল ২ টাকা ৩১ পয়সা। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৩২ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে গড় মূল্য বেড়েছে প্রায় ৪৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
দরপত্রে প্রভাব খাটিয়ে কাজ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাওসারুজ্জামান রুবেলসহ কয়েকজন প্রেস মালিকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তার মালিকানাধীন অগ্রণী ও কর্ণফুলী প্রেস প্রাথমিক স্তরের দুটি এবং মাধ্যমিক স্তরের একটি লটে অংশ নিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে তুলনামূলক বেশি দর দিয়ে কাজ পেয়েছে। কার্যাদেশ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান দুটি প্রায় তিন কোটি বই মুদ্রণের দায়িত্ব পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে প্রমা ও ব্রাইট প্রিন্টিং প্রেসের মালিক এসএম মহসিন প্রেস মালিকদের মধ্যে যোগসাজশের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, এনসিটিবিতে কোনো সিন্ডিকেট নেই এবং এবার তিনি খুব বেশি কাজ পাননি। যদিও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তার প্রতিষ্ঠান প্রায় ১২০ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু, প্রতিষ্ঠানটির সচিবসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও দরপত্রে অনিয়ম, প্রাক্কলিত মূল্য বৃদ্ধি ও গোপন তথ্য ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং তদন্তের ফলাফল পাওয়া গেলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক পাঁচটি লটে ৩১ থেকে ৩৪টি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিয়েছে। আগের অনেক লটে এক বা দুটি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের বিপরীতে পরবর্তী দরপত্রে এত বেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন আরও বাড়িয়েছে।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক্-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১টি বই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য সরকারি ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। আগের শিক্ষাবর্ষে বই মুদ্রণে ব্যয় হয়েছিল প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
বই সরবরাহের সময়সীমা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ৪০ দিনের মধ্যে মোট বইয়ের ৫০ শতাংশ সরবরাহ করার কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বই সরবরাহ করতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। চুক্তি ভঙ্গের ক্ষেত্রে জরিমানার বিধান থাকলেও সময়সীমা শিথিল করতে এনসিটিবির ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি তদারকি বাড়িয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী কয়েকটি ছাপাখানা পরিদর্শন করেছেন এবং মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নিম্নমানের বই ছাপানোর অভিযোগে ২০টির বেশি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে এনসিটিবি।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো সত্য নয়। তার বক্তব্য, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, দুদক নথিপত্র সংগ্রহ করে অভিযোগের সত্যতা, সম্ভাব্য যোগসাজশ এবং সরকারি অর্থের ক্ষতির বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে বই সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দরপত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।




