টিআইএন বা করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর নেওয়ার পর অনেকেই আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিধায় থাকেন। কেউ ব্যাংকিং, সম্পত্তি বা অন্য কোনো সেবার প্রয়োজনে টিআইএন নিয়েছেন, আবার কেউ সনদ নেওয়ার পর আর ব্যবহার করেননি। কিন্তু আইন অনুযায়ী রিটার্ন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলে নির্ধারিত সময়ে তা জমা না দেওয়ার কারণে অতিরিক্ত কর বা অন্যান্য জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে রিটার্ন জমা দেওয়া থেকে বিরত না থেকে বিলম্বে রিটার্ন দাখিলের নিয়ম জানা গুরুত্বপূর্ণ। রিটার্ন জমা দিতে দেরি হলে কী পরিমাণ অতিরিক্ত কর দিতে হবে, তা নির্ভর করতে পারে করদাতার ধরন, রিটার্ন জমা দেওয়ার সময়, আগের রিটার্নের অবস্থা এবং কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ পাওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয়ের ওপর।
বিলম্ব রিটার্ন বলতে কী বোঝায়?
রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য আইন নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর যে রিটার্ন দাখিল করা হয়, সেটিই বিলম্ব রিটার্ন। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৭৪ ধারায় এ বিষয়ে বিধান রয়েছে বলে প্রদত্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের অর্থ আইনে এ ধারায় পরিবর্তনের কথাও বলা হয়েছে।তবে সময় পেরিয়ে গেলেই সবার ক্ষেত্রে একই হারে অতিরিক্ত কর আরোপ হবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট করবর্ষে কার্যকর আইন ও করদাতার ব্যক্তিগত পরিস্থিতি যাচাই করা প্রয়োজন।
কারা বিলম্ব রিটার্ন জমা দেবেন?
যেসব ব্যক্তির আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া আইনত বাধ্যতামূলক, কিন্তু তাঁরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা জমা দেননি, তাঁদের বিলম্ব রিটার্ন জমা দিতে হতে পারে। এর মধ্যে করযোগ্য আয় থাকা ব্যক্তি এবং পেশা, পদ বা নির্দিষ্ট আর্থিক কার্যক্রমের কারণে রিটার্ন জমার প্রমাণ দেখাতে হয়—এমন করদাতারা থাকতে পারেন।
কোম্পানির পরিচালক, ফার্মের অংশীদার এবং আইনে যাঁদের রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেই রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। নিজের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।
দেরিতে রিটার্ন দিলে কী ধরনের আর্থিক প্রভাব পড়তে পারে?
প্রদত্ত তথ্যে ২০২৬-২৭ করবর্ষের জন্য সময়ভিত্তিক কর প্রণোদনা ও অতিরিক্ত করের কয়েকটি হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কর প্রণোদনা, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে জমা দিলে কোনো প্রণোদনা বা অতিরিক্ত কর না থাকা এবং পরবর্তী সময়গুলোতে অতিরিক্ত করের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
একই তথ্যে করবর্ষ শেষ হওয়ার পর রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজে থেকে দাখিল এবং কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ পাওয়ার পর দাখিল—এই দুই পরিস্থিতির জন্য আলাদা অতিরিক্ত করের হিসাবও দেওয়া হয়েছে। তবে এসব হার, সময়সীমা এবং প্রযোজ্যতার বিষয়গুলো প্রকাশের আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ নির্দেশনা ও কার্যকর আইনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষ করে ২০২৬ সালের অর্থ আইনের পরিবর্তন এবং করদাতাভেদে প্রযোজ্য ব্যতিক্রমের কারণে সবার জন্য একই হিসাব প্রযোজ্য নাও হতে পারে।
বিলম্বে রিটার্ন দিলে কর ছাড়ের সুবিধা থাকবে?
সময়মতো রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কিছু কর-সুবিধা বিলম্বে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় নাও পাওয়া যেতে পারে। ফলে দেরিতে দাখিলের কারণে অতিরিক্ত করের পাশাপাশি কর-সুবিধা হারানোর সম্ভাবনাও থাকে। ঠিক কোন সুবিধা প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট করবর্ষের আইন অনুযায়ী যাচাই করতে হবে।
টিআইএন বাতিল করলেই কি আগের দায় শেষ?
টিআইএন আর প্রয়োজন না হলে নির্ধারিত নিয়মে তা বাতিলের আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে। কিন্তু টিআইএন বাতিল হলেই আগের করবর্ষের রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা বা বকেয়া করের দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না। তাই বাতিলের আবেদন করার আগে নিজের রিটার্ন ও কর পরিশোধের অবস্থা যাচাই করা উচিত।
রিটার্ন দিতে দেরি হলে এখন কী করবেন?
প্রথমে আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ ও দায়ের তথ্য গুছিয়ে নিন। পাশাপাশি উৎসে কর কর্তনের প্রমাণ, আগের করবর্ষের রিটার্ন, কর পরিশোধের নথি এবং কর কর্তৃপক্ষের কোনো নোটিশ থাকলে সেটিও প্রস্তুত রাখুন।এরপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রযোজ্য ই-রিটার্ন ব্যবস্থা বা নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে রিটার্ন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। করের হিসাব জটিল হলে অভিজ্ঞ কর পরামর্শক বা কর আইনজীবীর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টিআইএন থাকা, রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়া এবং বিলম্বে রিটার্ন জমা দেওয়ার আর্থিক পরিণতি—এগুলো এক বিষয় নয়। নিজের অবস্থার সঙ্গে প্রযোজ্য আইন মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই নিরাপদ।




