মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগের স্থবিরতা ও কর্মসংস্থানের সংকটে চাপে সাধারণ মানুষ। সম্ভাবনার অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রয়োজন সুশাসন, সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি, প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানি খাতের সম্ভাবনা অর্থনীতিকে আশার আলো দেখাচ্ছে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, বিনিয়োগের স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সরকারের সীমিত রাজস্ব আয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশ কি আবার শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থানে ফিরতে পারবে? নাকি দীর্ঘস্থায়ী সংকটের দিকে এগোচ্ছে দেশ?
বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। তবে অর্থনীতির ভিতকে শক্তিশালী করার জন্য যে ধরনের সংস্কার, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন, তার বাস্তবায়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
প্রবৃদ্ধি কমছে, বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সূচক মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাথমিক হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ সামান্য উন্নতি হলেও কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক গতিশীলতা এখনো ফিরে আসেনি।
বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের অক্টোবরের পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। একই সময়ে আইএমএফ গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
এই পরিসংখ্যান অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা। কারণ প্রবৃদ্ধির গতি কমে গেলে নতুন বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবন
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান সংকট এখন দ্রব্যমূল্য। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও পরিবহন—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যয়ের চাপ রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আগস্টে এই হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে।
মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় শিকার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। যাদের আয় নির্দিষ্ট, কিন্তু ব্যয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। একজন চাকরিজীবী কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আয় বাড়ছে না, অথচ মাসের বাজার খরচ বাড়ছে নিয়মিত। ফলে সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে। কমছে ক্রয়ক্ষমতা, বাড়ছে ঋণনির্ভরতা।
অর্থনীতির এই বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়, শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন পরিমাপ করা যায় না। মানুষের আয়, ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি।
ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম দুর্বল জায়গা ব্যাংকিং খাত। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণখেলাপি, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ঋণসুবিধা গ্রহণ এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ এই খাতের ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল করেছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের অক্টোবরের বাংলাদেশ উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই হার ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ।
এটি শুধু ব্যাংকের সমস্যা নয়; পুরো অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। ব্যাংকে আমানতকারীদের অর্থ নিরাপদ রাখা, উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়া এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়লে নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ পেতে সমস্যায় পড়েন। বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের সুযোগ কমে যায়।
ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনা ছাড়া অর্থনীতির টেকসই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা
একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হচ্ছে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান। কিন্তু বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগে প্রত্যাশিত গতি নেই। উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং ব্যবসা পরিচালনার বাড়তি ব্যয় উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নারীরা কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। একই সময়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু সেই অনুপাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে, অনেক তরুণ পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন, আবার কেউ বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
কেবল সরকারি চাকরির ওপর নির্ভর করে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। বেসরকারি শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, কৃষিভিত্তিক শিল্প, প্রযুক্তি এবং সেবা খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়ে আশার আলো
সব সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৬ দশমিক শূন্য ১ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক হিসাবপদ্ধতি বিপিএম৬ অনুযায়ী এর পরিমাণ প্রায় ৩১ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্প দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে অবদান রাখছে।
তবে রিজার্ভ বাড়লেই অর্থনীতি সুস্থ হয়ে গেছে—এমন ধারণা সঠিক নয়। রিজার্ভের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে রপ্তানি আয় বাড়ানো, আমদানি ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ জরুরি।
রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা, উন্নয়নে সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে কর আদায়ের দুর্বলতা। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ ও প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলেও জাতীয় আয়ের তুলনায় সরকারের রাজস্ব আদায় এখনো অত্যন্ত কম।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। এই সীমিত রাজস্ব দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের চাহিদা পূরণ করা কঠিন।
করব্যবস্থাকে সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করতে হবে। করের আওতা বাড়াতে হবে, কর ফাঁকি বন্ধ করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমাতে হবে। শুধু সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ বাড়িয়ে রাজস্ব সংকট সমাধান করা যাবে না।
অর্থনৈতিক উত্তরণের উপায় কী?
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে হবে। সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক খাদ্য ও নগদ সহায়তা বাড়াতে হবে।
ব্যাংকিং খাতে সংস্কার
খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হতে হবে। ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপমুক্ত পেশাদার ব্যাংক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনে স্বচ্ছ নীতি গ্রহণ করতে হবে।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে হবে। নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে, যাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন।
কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমের সঙ্গে শিল্প ও শ্রমবাজারের চাহিদার সমন্বয় করতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বাজারসুবিধা দিতে হবে। নারী কর্মসংস্থানেও বিশেষ গুরুত্ব প্রয়োজন।রপ্তানি বহুমুখীকরণ
তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও জাহাজ নির্মাণের মতো খাতকে এগিয়ে নিতে হবে। নতুন রপ্তানি বাজার খুঁজতে হবে।
কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা
কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এতে একদিকে কৃষকের আয় বাড়বে, অন্যদিকে বাজারে খাদ্য সরবরাহ স্থিতিশীল থাকবে।
রাজস্ব ও সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা
কর ফাঁকি বন্ধ, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং সরকারি প্রকল্পে অপচয় ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের পরিবর্তে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়ায় এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে হবে।
সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা
অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি আস্থা। বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রাখতে হবে। দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থ পাচার ও প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক আস্থার সম্পর্ক
অর্থনীতিকে রাজনীতির বাইরে রেখে দেখার সুযোগ নেই। দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত না হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে না।
সরকার পরিবর্তন হতে পারে, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হতে পারে; কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক নীতিতে অযথা পরিবর্তন হলে তার মাশুল দিতে হয় ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষকে।
অর্থনীতির প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, ব্যাংকিং, জ্বালানি ও কর্মসংস্থান নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকতে হবে। যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, দেশের স্বার্থে এসব পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
সামনে সম্ভাবনা, তবে শর্তও রয়েছে
বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার দরজা এখনো খোলা। বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, কৃষি উৎপাদনের সক্ষমতা, তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী শ্রমশক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজার দেশের বড় সম্পদ।
কিন্তু এসব সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, আধুনিক শিল্পব্যবস্থা এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সাম্প্রতিক মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ। উভয় প্রতিষ্ঠানই ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, যথাযথ সংস্কার বাস্তবায়িত হলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।অর্থনীতির পুনরুদ্ধার হোক মানুষের জীবনে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটকে শুধু ডলার, রিজার্ভ, জিডিপি কিংবা বাজেটের হিসাব দিয়ে বিচার করলে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে না। অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায় একজন শ্রমিকের মজুরি, একজন কৃষকের ফসলের দাম, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর টিকে থাকার লড়াই এবং একজন শিক্ষিত তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়ে।
দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তবে তার জন্য প্রয়োজন সাহসী ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। ব্যাংক লুটের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন হতে হবে, বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং উৎপাদন ও কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ঋণ নিয়ে উন্নয়ন দেখানো আর মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন এক বিষয় নয়। কাগজে-কলমে প্রবৃদ্ধি অর্জন করাই অর্থনীতির চূড়ান্ত সাফল্য হতে পারে না। প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে বাজার করতে পারবেন, তরুণেরা কাজ পাবেন, কৃষক উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য পাবেন, উদ্যোক্তারা নিরাপদে বিনিয়োগ করতে পারবেন এবং দেশের সম্পদ দেশের মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনীতিকে সচল রাখা নয়, বরং অর্থনীতিকে মানুষের জন্য কার্যকর করে তোলা। সংকট থেকে উত্তরণের পথ কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্ব, সুশাসন, জবাবদিহি এবং বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের প্রকাশিত তথ্য ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন।




