প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, দুর্যোগে মানবিক সহায়তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সুবিচারে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ পেয়েছেন ঝালকাঠির তরুণ সংগঠক আরিফুর রহমান। এক দশকের বেশি সময় ধরে স্বেচ্ছাসেবা ও সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে এ পুরস্কার গ্রহণ করেন আরিফুর রহমান। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ ও সমাজ উন্নয়নে অবদানের জন্য তাকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি ইয়ুথনেট গ্লোবালের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আরিফুর রহমানের স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের সূচনা ২০১৬ সালে বরিশালের মান্তা জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় এ জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষের জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে সমস্যা হয়। শিক্ষা, চিকিৎসা ও সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এসব সমস্যা তাকে প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে।
ইয়ুথনেট গ্লোবালের ‘মান্তাকানেক্ট’ উদ্যোগের মাধ্যমে মান্তা জনগোষ্ঠীর ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক সাক্ষরতা ও সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরিতে কাজ করেছেন তিনি। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, তার উদ্যোগ ও সমন্বয়ে ৩০০ মান্তা সদস্যকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার আওতায় আনা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় এ জনগোষ্ঠীর জন্য কবরস্থানের জমির ব্যবস্থা নিয়েও অধিকারভিত্তিক কার্যক্রমে ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
দুর্যোগকালীন সহায়তাও তার কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০২০ সালে করোনা মহামারিতে কর্মহীন ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কমিউনিটি কিচেনের মাধ্যমে রান্না করা খাবার পৌঁছে দেন তিনি। ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও পরবর্তী বিভিন্ন বন্যায় ফেনী, সিলেট, কুড়িগ্রাম, চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও রংপুরের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে খাদ্য, চিকিৎসা ও জরুরি সামগ্রী বিতরণেও অংশ নেন। ২০২২ সাল থেকে কুড়িগ্রামে ‘চর ইয়ুথনেট কমিউনিটি’ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি। এ কার্যক্রমে চরাঞ্চলের ৯৫টি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের আশ্রয়, জীবিকা ও জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে কাজ চলছে।
পরিবেশ শিক্ষা ও সচেতনতা তৈরিতেও ভূমিকা রাখছেন আরিফুর রহমান। ইকো অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের বিভিন্ন কার্যক্রমে বরিশাল অঞ্চলের প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে বলে আয়োজকদের তথ্য। ঝালকাঠির ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠা ইয়ুথ ক্লাইমেট ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ৩০০ শিক্ষার্থী ও ২০ জন শিক্ষক। এসব ক্লাবের সদস্যরা বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্লাস্টিকদূষণ প্রতিরোধে কাজ করছে।
এ ছাড়া কীর্তনখোলা নদীর দূষণ রোধ, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, জলাভূমি পুনরুদ্ধার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু সুবিচার নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগে যুক্ত রয়েছেন তিনি। সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীদের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরার পাশাপাশি নারীর অধিকার ও তরুণদের মধ্যে ইতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতেও কাজ করছেন।
২০২৫ সালে ঝালকাঠি জেলার শ্রেষ্ঠ যুব সংগঠক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন আরিফুর রহমান। বিবিএ সম্পন্ন করে বর্তমানে এলএলবি পড়ছেন তিনি। ভবিষ্যতে তরুণদের সবুজ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজ করতে চান তিনি।
ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বলেন, আরিফুর রহমান মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে দয়া বা দান হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন। তার এ অর্জন সমাজ পরিবর্তনে তরুণদের ভূমিকা রাখার সম্ভাবনাকে তুলে ধরে।