পিরোজপুরে সুপারির আবাদ ও বাণিজ্য বাড়লেও চলতি মৌসুমে প্রত্যাশিত ফলন পাচ্ছেন না চাষিরা। উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে কাঁচা সুপারির দাম বেড়েছে। তবে বাড়তি দামেও অনেক কৃষকের ক্ষতি পুষিয়ে উঠছে না। এতে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম অর্থকরী ফসল সুপারি ঘিরে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
জেলার কাউখালী, ভান্ডারিয়া, মঠবাড়িয়া, নেছারাবাদ, জিয়ানগর ও সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় সুপারির চাষ হয়। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব সুপারি ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।
কাউখালীর হাটে কোটি টাকার বাণিজ্য
দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড় সুপারির হাট হিসেবে পরিচিত কাউখালীতে সপ্তাহের শুক্র ও সোমবার বসে জমজমাট বাজার। ভোর থেকেই সেখানে সুপারি বাছাই, দর-কষাকষি, বস্তাবন্দী ও পরিবহনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। পিরোজপুরের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও ঝালকাঠি এবং আশপাশের এলাকা থেকে সুপারি নিয়ে আসেন বিক্রেতারা।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, ২১ ঘা বা ২১০টি কাঁচা সুপারিতে এক কুড়ির হিসাব করা হয়। আকার ও মানভেদে বর্তমানে প্রতি কুড়ি কাঁচা সুপারি ৪০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছোট আকারের সুপারি এর চেয়ে কম দামেও বিক্রি হচ্ছে। শুকনো সুপারি প্রতি ৪০ কেজি বা এক মণ ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চাষি আবু জাফর বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার ফলন কম হলেও দাম ভালো পাচ্ছেন। আগামী বছর ফলন বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি। পিরোজপুর সদর উপজেলার কদমতলা ইউনিয়নের পোরগোরা এলাকার কৃষক মো. আবুল সরদার বলেন, সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে। ফলন ভালো হলে আয় আরও বেশি হতো।
চাষি মোতালেব হাওলাদার জানান, গত বছর যে বাগানের সুপারি দুই লাখ টাকায় বিক্রি করেছিলেন, এবার সেই বাগান থেকে এক লাখ টাকার সুপারি বিক্রি করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন।
দাম বাড়লেও স্বস্তি নেই
কাউখালীর হাটের ব্যবসায়ী ফোরকান হাওলাদার বলেন, গত বছর এ সময়ে প্রতি কুড়ি কাঁচা সুপারি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। এবার তা বেড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় উঠেছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে।
জিয়ানগরের ব্যবসায়ী জাকির হোসেন বলেন, ট্রাকে করে তারা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে সুপারি পাঠান। এবার উৎপাদন কম হওয়ায় বেশি দামে সুপারি কিনতে হচ্ছে। ফলে ব্যবসাও প্রত্যাশা অনুযায়ী হচ্ছে না।
নেছারাবাদ উপজেলার ব্যবসায়ী ফয়সাল হোসাইন জানান, মৌসুমে কাঁচা সুপারি কিনে মাটির নিচে পলিথিন বিছিয়ে সংরক্ষণ করেন তিনি। প্রায় ছয় মাস পর বাজারে সরবরাহ কমলে সেগুলো বিক্রি করেন, যাতে ভালো দাম পাওয়া যায়।
কাউখালীর বাজারের ইজারাদার রফিকুল ইসলাম বলেন, শত বছরের পুরোনো এ হাটে পিরোজপুরের বিভিন্ন উপজেলা ও ঝালকাঠি থেকে মানুষ সুপারি বিক্রি করতে আসেন। বাজারের খাজনা তুলনামূলক কম হওয়ায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতি বাড়ছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত শুক্র ও সোমবার নিয়মিত হাট বসবে।
উৎপাদন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে পিরোজপুরে ৪ হাজার ৬৬৯ হেক্টর জমিতে সুপারির আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৮ হাজার ৬৭৬ মেট্রিক টন। এ উৎপাদনের সম্ভাব্য বাজারমূল্য ৮৪০ থেকে ৯৩০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ মূল্যায়নের ভিত্তি ও বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই করা প্রয়োজন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, এবার পিরোজপুরে সুপারির ফলন কম হয়েছে। অন্যান্য অনেক ফসলের তুলনায় সুপারি লাভজনক হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিক বাগান গড়ে উঠছে। ফলন কম হওয়ায় কৃষকেরা তুলনামূলক বেশি দাম পাচ্ছেন। সুপারির উৎপাদন বাড়াতে কৃষি বিভাগ চাষিদের নিয়মিত পরিচর্যা ও বাগান ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছে।
সুপারির আবাদ, বিপণন ও সংরক্ষণ ঘিরে পিরোজপুরে বহু কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছে। তাই ফলন কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু কৃষকের আয়েই নয়, স্থানীয় বাজার ও কর্মসংস্থানেও পড়তে পারে। উৎপাদন কমার কারণ শনাক্ত করতে আবহাওয়া, রোগবালাই, পরাগায়ন ও বাগান পরিচর্যার বিষয়ে মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণ জরুরি। পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য উৎপাদন ও বাজারদরের তথ্য প্রকাশ করা গেলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আগাম পরিকল্পনা করতে পারবেন।