বাগেরহাট সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের রহিমাবাদ গ্রামে বিষপানে ১৬ বছর বয়সী স্কুলছাত্র কাজী মারজানের মৃত্যুর পর মাদকের সহজলভ্যতা নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। মাদক কেনাবেচা বন্ধের দাবিতে একত্রিত হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মাদক বিক্রির অভিযোগ ওঠা একটি বাড়িতে গিয়ে ঘর সরানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তারা।
মারজান রহিমাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, সে আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। তার বাবা কাজী এনামুল হক রিপন অনেক আগেই মারা গেছেন। মা ও ছোট বোনকে নিয়ে আর্থিক সংকটের মধ্যে বেড়ে উঠছিল সে।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, মারজান গত দুই থেকে তিন বছর ধরে মাদকাসক্ত ছিল। মাদক কেনার জন্য সে প্রায়ই পরিবারের কাছে টাকা চাইত। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে চাহিদামতো টাকা দিতে না পারলে সে মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়ত বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৭টার দিকে বিষপান করে মারজান। পরে তাকে উদ্ধার করে বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৩টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার বলেন, অতিরিক্ত মাত্রায় বিষপানের কারণে কিশোরটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ৩টার দিকে তার মৃত্যু হয়। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে তারা প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। ময়নাতদন্ত-সংক্রান্ত কার্যক্রম শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মারজানের মৃত্যুর পর এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রহিমাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের আশপাশসহ গ্রামের গাবতলা থেকে ভাঙ্গড় এলাকা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে মাদক কেনাবেচা চলে। এতে তরুণদের একটি অংশ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা শেখ হাসানুল বান্না বলেন, রহিমাবাদ একসময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু মাদকের বিস্তার নিয়ে এখন তারা উদ্বিগ্ন। মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করা ব্যক্তিদের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে অনুরোধ করা হলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি বলে তার অভিযোগ। তিনি বলেন, মারজানকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, তবে মাদকের কারণে যেন আর কোনো পরিবারের সন্তানকে প্রাণ হারাতে না হয়, সে জন্য প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল খানও মাদকের সহজলভ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার দাবি, এলাকায় প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি মাদক কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। তবে তার অভিযোগের স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি। অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বক্তব্যও পাওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা বেগ মোকাররম হোসেন বলেন, বিদ্যালয়ের সামনে মাদক কেনাবেচার বিষয়ে তারা একাধিকবার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুরোধ করেছেন। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও জানিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। মাদকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চান স্থানীয়রা।
মারজানের মৃত্যুর পর এলাকাবাসী একত্রিত হয়ে মাদক বিক্রির অভিযোগ ওঠা একটি বাড়িতে যান এবং ঘর সরানোর উদ্যোগ নেন বলে স্থানীয়রা জানান। তাদের উপস্থিতির খবর পেয়ে ওই বাড়ির এক ব্যক্তি চলে যান বলেও দাবি করেন তারা। তবে এ ঘটনায় কী ধরনের আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বাগেরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সামসুল আরেফিন বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে পাঠিয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি মামলা হয়েছে। এক কিশোরের মৃত্যুতে শোকের পাশাপাশি মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে এলাকায়। স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলো তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং মাদকাসক্ত কিশোর-তরুণদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হোক।