নদীর বুকে জেগে ওঠা চর থেকে গড়ে ওঠা শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কাজীরহাট এখন মসলা ও তেলবীজজাতীয় ফসলের বড় পাইকারি বাজার। সপ্তাহে মাত্র দুই দিন—রবি ও বৃহস্পতিবার—এই হাটে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ কোটি টাকার কৃষিপণ্য কেনাবেচা হয়। ধনিয়া, কালিজিরা, শর্ষে, পেঁয়াজ, রসুন, শুকনা মরিচ, হলুদ ও মেথিসহ নানা পণ্যের বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে এখানে জমে ওঠে কৃষক, আড়তদার ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাইকারদের মিলনমেলা।
জাজিরা উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের ডুবিসায়বর এলাকায় কীর্তিনাশা নদীর তীরে কাজীরহাটের অবস্থান। স্থানীয়ভাবে ১৯৮১ সালে যাত্রা শুরু করা এ বাজারে বর্তমানে প্রায় দেড় হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। কৃষিপণ্য কেনাবেচার জন্য আছে ৩০টি আড়ত। প্রতি হাটে দুই শতাধিক পাইকার বিভিন্ন ধরনের ফসল কিনতে আসেন। শরীয়তপুরের পাশাপাশি মাদারীপুরের কৃষকেরাও এখানে তাদের উৎপাদিত ফসল নিয়ে আসেন।
এক দিনেই লেনদেন ২৫ কোটি টাকার বেশি
আড়তদারদের হিসাব অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবারের হাটে ধনিয়া, কালিজিরা, শর্ষে, রসুন, পেঁয়াজ ও শুকনা মরিচের বেচাকেনা হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকার। এর মধ্যে ৩০০ টন ধনিয়া ছয় কোটি টাকা, ২০০ টন কালিজিরা ছয় কোটি টাকা এবং ৩০০ টন শর্ষে তিন কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া রসুন, পেঁয়াজ ও শুকনা মরিচ বিক্রি হয়েছে আরও পাঁচ কোটি টাকায়। তিল, তিসি, সূর্যমুখী ও ভুট্টাসহ অন্যান্য তেলবীজজাতীয় ফসলের বেচাকেনা হয়েছে আরও পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার। সব মিলিয়ে এক দিনের লেনদেন দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ২৬ কোটি টাকা।
কাজীরহাটের অন্যতম আকর্ষণ হলো, একই পণ্যের একাধিক ক্রেতা পাওয়া যায়। ফলে কৃষকেরা দরদাম যাচাই করে পছন্দমতো ক্রেতার কাছে ফসল বিক্রি করতে পারেন। সাত বিঘা জমিতে ধনিয়া, মেথি ও পেঁয়াজের চাষ করেন কৃষক সবুর আলী। গত বৃহস্পতিবার তিনি ৫০০ কেজি ধনিয়া নিয়ে হাটে আসেন। উৎপাদন খরচ ও সংসারের প্রয়োজন মেটাতে সাধারণত তার উৎপাদিত ফসলের প্রায় ৬০ শতাংশ বিক্রি করেন। বাকি অংশ ভালো দামের আশায় রেখে দেন।
ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে যায় কৃষিপণ্য
কাজীরহাটের ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছ থেকে মসলা ও তেলবীজ কিনে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ী এবং ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করেন। দীর্ঘদিন ধরে এ হাটে ব্যবসা করা এক ব্যবসায়ী জানান, প্রতি হাটে তার নিজের কেনাকাটার পরিমাণ অন্তত ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা। বড় অঙ্কের লেনদেন সহজ করতে হাটের আশপাশে রয়েছে পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শরীয়তপুরে প্রায় ৮৭ হাজার ৮২১ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে মসলা ও তেলবীজজাতীয় ফসলের আবাদ হয়। এসব জমি থেকে বছরে প্রায় এক লাখ ৯২ হাজার মেট্রিক টন ফসল উৎপাদিত হয়।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিরা সরাসরি কাজীরহাটে এসে কৃষিপণ্য সংগ্রহ করেন। এতে কৃষক ও বড় ক্রেতাদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হয়েছে, পাশাপাশি উৎপাদিত ফসল বিক্রির সুযোগও বেড়েছে।
স্থানীয় কাজী বংশের মুরব্বি আবদুল খালেক কাজী কীর্তিনাশা নদীর তীরে নৌপথে যোগাযোগের সুবিধা বিবেচনায় হাটটি প্রতিষ্ঠা করেন। তার বংশের নাম অনুসারেই বাজারটির নাম হয় কাজীরহাট। কয়েক দশকে ছোট পরিসরের এ হাট এখন বড় পাইকারি বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও আড়তদারসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ।




