রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ চলায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে সাজেক ভ্যালি। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্কের পাশাপাশি পর্যটন, পরিবহন ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, আগের দিনের তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক রয়েছে।
এদিকে শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে ছাত্র-সংগ্রাম জনতার পরিষদ নামে একটি সংগঠন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে সংগঠনটি এ কর্মসূচির কথা জানায়। সাজেক সড়কে চলমান অবরোধের মধ্যে নতুন এ কর্মসূচি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমা জানান, সাজেকের ১০ ও ১৪ কিলোমিটার এলাকায় তাদের পিকেটিং চলছে। তার দাবি, স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে এবং ভয়ে অনেকে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও সংগঠনগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাজেক সড়কে কয়েক দফায় অবরোধ চলছে। এর আগে ১১ অক্টোবর প্রথম দফায় অবরোধ শুরু হলে প্রশাসনের আশ্বাসে তা স্থগিত করা হয়। দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগ তুলে ১৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফা এবং গত বৃহস্পতিবার থেকে তৃতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করা হয়। সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, তাদের দাবি বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হওয়ায় এ কর্মসূচি চলছে।
সংগঠন দুটির নেতাদের অভিযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু) সশস্ত্র সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে মহড়া দিয়ে সাধারণ মানুষ ও জুমচাষিদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংগঠন দুটির নেতারা নিরাপত্তা নিশ্চিত ও সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মারজান বলেন, সাজেকের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অবরোধের কারণে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ রয়েছে। স্থানীয়দের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ছেড়ে যাওয়ার খবর তিনিও শুনেছেন। তবে বৃহস্পতিবারের মতো পরিস্থিতি বর্তমানে নেই বলে জানান তিনি। সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন বলেন, সড়কে যানবাহন চলাচল করছে না এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
পর্যটন খাতে বড় ক্ষতির আশঙ্কা
অবরোধের কারণে সাজেকের পর্যটন ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা জানান, পর্যটক না থাকায় আগের বুকিংগুলো বাতিল হয়েছে। রিসোর্ট মালিকদের তথ্যমতে, সাজেকে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৩৫টি রিসোর্ট এবং শতাধিক রেস্তোরাঁ রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০টি পর্যটকবাহী গাড়ি চলাচল করে বলে তাদের দাবি।
নভেম্বর থেকে জানুয়ারি সাজেকের পর্যটনের ভরা মৌসুম। এ সময় প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন হাজার পর্যটক অবস্থান করেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এ তিন মাসে আবাসন, খাবার, যাতায়াত ও ঘোরাঘুরি মিলিয়ে পর্যটকেরা প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা ব্যয় করেন। চলমান অবরোধে বুকিং বাতিল ও অগ্রিম অর্থ ফেরত দেওয়ার চাপে ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন।
রয়েল সাজেক রিসোর্টের মালিক এসএম জিয়াউল হক বলেন, তিনি প্রায় এক লাখ টাকার বুকিং বাতিল করে পর্যটকদের অর্থ ফেরত দিয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসনিক আলোচনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক জানান, পর্যটকদের জন্য কয়েক লাখ টাকার খাদ্যসামগ্রী মজুত করেছিলেন। অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে এসব পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাজেক রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি ও রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য সুপর্ন দেব বর্মন বলেন, পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে অনেক উদ্যোক্তা রিসোর্ট ও কটেজ সংস্কারে বিনিয়োগ করেছেন। এখন বুকিং বাতিল করে অর্থ ফেরত দিতে হচ্ছে। সংকটের সমাধান না হলে এ খাতের সঙ্গে জড়িত সবাই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
স্থানীয় জীবনযাত্রাও ব্যাহত
সড়ক বন্ধ থাকায় সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ও জরুরি ওষুধ পৌঁছানো ব্যাহত হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরিবহন সংকটে জুমচাষিরা উৎপাদিত ফসল ও কৃষিপণ্য বাজারে নিতে পারছেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। পর্যটন খাতের পাশাপাশি পরিবহন, দোকানপাট ও রেস্তোরাঁনির্ভর মানুষের আয়েও এর প্রভাব পড়ছে।
এদিকে সাজেকে পর্যটকবাহী গাড়ির বহর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা এবং সড়ক অবরোধের নিন্দা জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি)। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দেওয়া বিবৃতিতে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন কায়েস ও সাধারণ সম্পাদক মো. হাবীব আজম ঘটনার নিন্দা জানান এবং পাহাড়ে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা দাবি করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা অবরোধজনিত সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা, নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত এবং পর্যটনকেন্দ্রটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন।