দক্ষিণাঞ্চলের মাছের বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার ফলতিতা বাজার। প্রতিদিন ভোর থেকে এখানে চলে মাছ কেনাবেচা। স্থানীয় ও আশপাশের মৎস্যঘের থেকে আসা মাছ কিনতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা জড়ো হন। চিংড়িসহ কিছু মাছের গন্তব্য বিদেশের বাজারও।
বাজারসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এখানে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়। মৌসুমের ব্যস্ত সময়ে লেনদেন বেড়ে তিন থেকে চার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। মাছের আড়ত, পরিবহন ও শ্রমের সঙ্গে যুক্ত থেকে বহু মানুষের জীবিকা চলে এ বাজারকে কেন্দ্র করে।
সকাল ৬টার দিকে বিভিন্ন যানবাহনে মাছ আসতে শুরু করে। সকাল ৮টার পর আড়তগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যস্ততা বাড়ে। পাইকাররা মাছের আকার ও মান যাচাই করে দাম ঠিক করেন। শ্রমিকেরা মাছ প্যাকেটজাত করে গাড়িতে তুলে দেন। সাধারণত বেলা ১টা পর্যন্ত চলে কেনাবেচা।
রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়া, পাবদা, পাঙ্গাসের পাশাপাশি বাগদা, গলদা ও ভেনামি চিংড়ি বিক্রি হয় এখানে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা এই বাজার থেকে মাছ নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় সরবরাহ করেন।
মাছ বিক্রেতা রুবেল বলেন, ফলতিতায় মাছ নিয়ে এলে দ্রুত বিক্রি করা যায়। তবে খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় চাষিদের লাভ কমেছে, অনেক সময় লোকসানও হচ্ছে। রামপালের মাছচাষি সৌরভের মতে, বর্তমানে মাছের দাম কিছুটা কম থাকলেও অন্য বাজারের তুলনায় ফলতিতায় ভালো দাম পাওয়া যায়।
ব্যবসায়ী টিটু জানান, বাজারে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া গেলেও আগের তুলনায় বেচাকেনা কিছুটা কমেছে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করা মো. শহিদুল ইসলামের ভাষ্য, প্রায় চার দশকের বেশি সময় ধরে ফলতিতা একটি পরিচিত মাছের মোকাম হিসেবে ব্যবসায়ীদের আকর্ষণ করে আসছে।
বৃষ্টি ফিশের অংশীদার মো. মিজান ও ব্যবস্থাপক খিরোদ পোদ্দার বলেন, তাদের আড়তে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার মাছ বিক্রি হয়। বিভিন্ন এলাকার চাষিরা সরাসরি ঘের থেকে মাছ এনে বিক্রি করেন। আড়তে ওজন ও দাম নিয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে খাবার ও পোনার দাম বাড়লেও অনেক চাষি উৎপাদন খরচ অনুযায়ী দাম পাচ্ছেন না। আবার বাকিতে মাছ বিক্রির টাকা সময়মতো না পাওয়ায় ব্যবসায়ীদেরও আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বাজারের শ্রমিক ছামাদ জানান, প্রায় ১০ বছর ধরে মাছ প্যাকেটজাত করা ও পরিবহনে তোলার কাজ করছেন তিনি। দৈনিক কাজের পরিমাণ অনুযায়ী তার আয় ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। পাইকার আকরাম বলেন, তুলনামূলক কম দামে বিভিন্ন ধরনের মাছ পাওয়া যায় বলে তিনি এখান থেকে মাছ কিনে নিজ এলাকায় বিক্রি করেন।
বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাজকুমার বিশ্বাস জানান, ফলতিতা বাজারে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ থেকে ৪৫ মেট্রিক টন মাছ বিক্রি হয়। বছরে মোট বিক্রির পরিমাণ ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেট্রিক টন। প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ মেট্রিক টন মাছ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। বছরে এখানে প্রায় সাত থেকে আট হাজার মেট্রিক টন চিংড়ি বিক্রি হয় বলেও জানান তিনি।
তবে বাজারে সুপেয় পানির সংকট, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের অভাব এবং উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা। তার মতে, এসব অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাজারের পরিবেশ ও কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে পারে।
বিপুল বেচাকেনার এ বাজারে মাছচাষিদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, উৎপাদন ব্যয় সামাল দেওয়া এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করাই এখন সংশ্লিষ্টদের বড় চ্যালেঞ্জ।




