দুই আঞ্চলিক সংগঠনের ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধে রাঙ্গামাটির সীমান্তবর্তি বাঘাইছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র সাজেকে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। অবরোধের কারণে সাজেকের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ কার্যত বন্ধ রয়েছে। সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় একদিকে স্থবির হয়ে পড়েছে সার্বিক পর্যটন খাত, অন্যদিকে সাজেক ইউনিয়নের বেশ কিছু দুর্গম গ্রামে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের পাশাপাশি তীব্র ওষুধ সংকটের আশংকা করা হচ্ছে।
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হলেও পাচঁটির মধ্যে একটি দাবির বিষযে সমঝোতা হয়নি। ফলে অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলনকারী দুই সংগঠন সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন। এতে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালিতে পর্যটন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। আন্দোলনকারীদের ৫ দফা দাবির মধ্যে চারটি নিয়ে দুই পক্ষই সম্মত হলেও চার নম্বর দফায় আটকে যায় আলোচনা। ৪র্থ দফায় বলা হয়েছে 'সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় জেএস এস সন্তু লারমা গ্রæপের সশস্ত্র সদস্যদেরকে সাজেক থেকে অতি দ্রæত সরিয়ে নিতে হবে। তাদের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও জুলুম বন্ধ করতে হবে'। তবে এই দাবি বাস্তবায়ন নিয়ে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় চান সরকার পক্ষ। কিন্তু কেবল তিন দিনের সময় দিতে সম্মত হন আন্দোলনকারীরা।
দেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন সাজেকে ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী প্রায় ৩১ হাজার ৩৯৫ জন মানুষ বসবাস করেন। টানা অবরোধ ও যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় বিশেষ করে ২ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ মানুষের জীবনে বড় ধরনের নাভিশ্বাস উঠেছে।
সাজেকে রেস্তোরা ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক জানান,তাদের রেস্তোরায় মোট আটজন কর্মচারী রয়েছে। অবরোধের কারনে সবাই বেকার হয়ে পড়েছে। এছাড়া রেস্তোরার জন্য যেসব মালামাল ক্রয় হয়েছে অবরোধের বন্ধের কারনে তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
মুদি দোকাদার জনসিম চাকমা বলেন, এখানে প্রধানত ৩টি মুদির দোকান রয়েছে। আমার দোকানে ইতোমধ্যে চাল ও চিনি শেষ হয়ে গেছে। পাশের অন্যান্য দোকানে ডাল, সয়াবিন তেল, চিনি এমনকি ডিজেল ও অকটেনও শেষ। যেটুকু মজুত আছে, তা দিয়ে আর মাত্র দুই-একদিন চলা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, গত ২১ অক্টোবর শেষবারের মতো পণ্যবাহী গাড়ি এসেছিল। পরিস্থিতি যে এত জটিল হবে, তা কেউ ধারণা করতে পারেনি।
স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী জিয়াউল হক যুবরাজ বলেন, পর্যটক না থাকলেও সাজেকের রিসোর্ট ও কটেজে অনেক কর্মচারী রয়ে গেছেন। চার দিন ধরে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় কোনো মালামাল ঢুকছে না। ফলে স্থানীয়দের পাশাপাশি রিসোর্ট-কটেজ কর্মচারীরাও চরম খাদ্যসংকটে পড়েছেন।
সাজেক ইউনিয়নের পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা জানান সাজেকের কিছু কিছু এলাকায় পণ্যবাহী গাড়ি না আসায় স্থানীয়দের মাঝে খাদ্য সংকট হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। শুধু খাদ্য সংকট নয়, ফার্মেসিগুলোতে কিছু ওষুধ থাকলেও জরুরি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর তীব্র ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় কোনো রোগী বা দুর্ঘটনাকবলিত মানুষকে হাসপাতালে নেওয়ার মতো কোনো যানবাহন কিংবা যাতায়াতব্যবস্থা চালু নেই। এতে মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, সাজেক এখন প্রায় পর্যটকশূন্য। পর্যটক না থাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকার ব্যবসা হারাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। সাজেককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ১৩৫টি কটেজ-রিসোর্ট, প্রায় ৫০টি রেস্টুরেন্ট এবং শতাধিক ভ্রাম্যমাণ দোকান এখন বন্ধ হওয়ার মুখে। অথচ কটেজ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন দিতে হচ্ছে, যা উদ্যোক্তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মারজানা জানান, খাদ্য সংকটের বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য, চেয়ারম্যান কিংবা হেডম্যান-কারবারিরা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাননি। তারা জানালে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রাঙ্গামাটির সংসদ সদস্য ও সাবেক পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেছেন,সাজেকে খাদ্য সংকট সৃষ্টি হওয়ার কোন সংবাদ পাওয়া গেলে মানবিক এ বিষয়ে প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবে।