বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর প্রকল্প ঘিরে মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন—কীভাবে পরমাণুর শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে? কীভাবেই বা সেই বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে মানুষের ঘরে ঘরে?
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউরেনিয়াম জ্বালানির নিউক্লিয়ার ফিশন বা পারমাণবিক বিভাজন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপশক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ তৈরি করা হবে। কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হবে এই পুরো প্রক্রিয়া।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত পরমাণুবিজ্ঞানীদের সাথে কথা বলা জানা যায়, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও ধারাবাহিক। রিয়্যাক্টরে উৎপন্ন তাপ থেকে বাষ্প তৈরি, সেই বাষ্পের সাহায্যে টার্বাইন ঘোরানো এবং জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন—এভাবেই সম্পন্ন হয় পুরো প্রক্রিয়া।
রিয়্যাক্টরের ভেতরে তৈরি হবে তাপ :
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো রিয়্যাক্টর। এর ভেতরে ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপন করা হয়।
রিয়্যাক্টরের ভেতরে নিয়ন্ত্রিতভাবে নিউট্রনের আঘাতে ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণুর নিউক্লিয়াস বিভাজিত হয়। এ সময় বিপুল পরিমাণ তাপশক্তি নির্গত হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিশন বা পারমাণবিক বিভাজন।
এই তাপের সাহায্যে রিয়্যাক্টরের প্রাথমিক সার্কিটের পানি উত্তপ্ত করা হয়। পানির তাপমাত্রা প্রায় ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলেও উচ্চচাপ বজায় রাখার কারণে তা তরল অবস্থায় থাকে।
স্টিম জেনারেটরে তৈরি হবে বাষ্প :
রিয়্যাক্টর থেকে পাম্পের সাহায্যে উত্তপ্ত পানি পাঠানো হয় স্টিম জেনারেটরে। সেখানে প্রাথমিক সার্কিটের পানির তাপ ব্যবহার করে দ্বিতীয় একটি পৃথক সার্কিটের পানি বাষ্পে পরিণত করা হয়।
দুটি সার্কিট আলাদা থাকায় স্বাভাবিক পরিচালন অবস্থায় প্রাথমিক সার্কিটের তেজস্ক্রিয় পদার্থ দ্বিতীয় সার্কিটের পানিতে সরাসরি মিশে যায় না।
স্টিম জেনারেটরে তৈরি হওয়া উচ্চচাপের বাষ্প পাঠানো হয় টার্বাইনে। বাষ্পের চাপে টার্বাইনের ব্লেড ঘুরতে থাকে। এভাবে বাষ্পের তাপশক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
টার্বোজেনারেটরে উৎপাদিত হবে বিদ্যুৎ :
টার্বাইনের সঙ্গে শ্যাফটের মাধ্যমে যুক্ত থাকে জেনারেটর। টার্বাইন ঘুরলে জেনারেটরের রোটরও ঘুরতে থাকে। এর ফলে চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের পরিবর্তন ঘটে এবং তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।
বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডের আবিষ্কৃত তড়িৎচুম্বকীয় আবেশ নীতির ওপর ভিত্তি করেই এই বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা কাজ করে।
এরপর উৎপাদিত বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে উচ্চ ভোল্টেজে উন্নীত করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। সেখান থেকে সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের ঘরে পৌঁছে যাবে রূপপুরের বিদ্যুৎ।
কবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে রূপপুরের বিদ্যুৎ?
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিতে ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। গত ৩০ অক্টোবর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা) প্রথম ইউনিটে পাওয়ার স্টার্টআপ কার্যক্রমের স্টেজ-সি শুরু করার অনুমোদন দিয়েছে।
তবে এই অনুমোদনের অর্থ এই নয় যে, সঙ্গে সঙ্গেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। এর আগে রিয়্যাক্টর, টার্বাইন, জেনারেটরসহ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে হবে।
পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন পাম্প, ভালভ, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পরীক্ষা করা হবে। এরপর নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে রিয়্যাক্টরের ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই শেষে টার্বাইনে বাষ্প সরবরাহ করে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা হবে।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো হবে। প্রতিটি পর্যায়ে কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা নিশ্চিত করেই পরবর্তী ধাপে এগোনো হবে।
সব প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হলে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে সর্বোচ্চ ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়াবে ২৪০০ মেগাওয়াট।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এখন সবার অপেক্ষা, পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের বিভিন্ন ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করে কবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ।