সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবারও হামলার ঘটনা ঘটেছে। রোববারের এ হামলায় পাকিস্তানের এক নাগরিক নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন। সোমবার সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে। এর আগের দিন শনিবার বিমানবন্দরে হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হন। পরে আহত এক ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হলে শনিবারের হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ জনে। ফলে দুই দিনের হামলায় মোট নিহতের সংখ্যা অন্তত ১৪।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যু, চারজন আইসিইউতে
শনিবারের হামলায় নিহতদের মধ্যে দুই বাংলাদেশি রয়েছেন। তারা হলেন কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরি এবং বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামের মো. শাহেদ আহম্মেদ। নাসরুল্লাহ ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। শাহেদ সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় নিহত দুই বাংলাদেশির পরিচয় নিশ্চিত করেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় গুরুতর আহত আরও চার বাংলাদেশি সৌদি আরবের একটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের হামলায় নিহত ১২ জনের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক ও দুইজন বাংলাদেশি ছিলেন। অন্য নিহতদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, জর্ডান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও সুদানের নাগরিক রয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানানো হয়েছে।
দ্বিতীয় হামলায় টার্মিনালে আগুন
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা, রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার বিমানবন্দরের টার্মিনাল এলাকায় নতুন করে আঘাত হানে একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো আঘাতকারী বস্তু। সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেনবিষয়ক সামরিক জোটের ভাষ্য অনুযায়ী, টার্মিনাল-৪ এলাকায় আঘাতের পর আগুন ধরে যায়। সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানায়, এ ঘটনায় পাকিস্তানের এক নাগরিক নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিমানবন্দরের কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। দেশটির পূর্বাঞ্চলেও একটি ড্রোন প্রতিহত করার খবর জানিয়েছে সামরিক জোট। এসব ঘটনায় বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বন্ধ বিমানবন্দর, ব্যাহত ফ্লাইট
শনিবারের প্রাণঘাতী হামলার পর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। সোমবার পর্যন্ত প্রকাশিত আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলোতে বিমানবন্দরের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও স্থাপনার নিরাপত্তা পরীক্ষা চালানোর কথা বলা হয়েছে। হামলার কারণে বিভিন্ন ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন ও যাত্রা ব্যাহত হয়েছে। তবে বিমানবন্দর পুরোপুরি কবে চালু হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত সময় জানানো হয়নি।
গালফ নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে চলাচলকারী কয়েকটি উড়োজাহাজ সংস্থা ফ্লাইট বাতিল করেছে অথবা সময়সূচিতে পরিবর্তন এনেছে। ফলে রিয়াদগামী এবং রিয়াদ থেকে অন্য গন্তব্যে যাত্রার পরিকল্পনা করা যাত্রীরা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুতি বিদ্রোহীরা রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করেছে। গত কয়েক দিনে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হামলার কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে এবং ঘটনাটিকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, সৌদি বিমানবন্দরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে হুতিরা বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। এতে ইয়েমেনের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হান্স গ্রুন্ডবার্গ বেসামরিক স্থাপনায় হামলার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার মতে, এ ধরনের হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি এবং ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তোলে।
পরপর হামলা ও দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় সৌদি আরবে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক যাতায়াত, ফ্লাইটের পরিবর্তন এবং আহত বাংলাদেশিদের চিকিৎসার অগ্রগতি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।