ভোরের আলো ফুটতেই গ্রামের পথে শুরু হয় নারীদের কর্মব্যস্ততা। কেউ ধানখেতে আগাছা পরিষ্কার করেন, কেউ বীজতলা তৈরি করেন, কেউ গবাদিপশুর যত্ন নেন। বাড়ির উঠোনে সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি পালন, বীজ সংরক্ষণ কিংবা পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজেও তাঁদের অবদান রয়েছে। তাঁদের শ্রমে সচল থাকে কৃষি, শক্তিশালী হয় গ্রামীণ অর্থনীতি, টিকে থাকে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক।
কিন্তু এই অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি কতটা পান তাঁরা? কৃষিতে শ্রম দিলেও জমির মালিকানা, কৃষিঋণ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং উৎপাদিত ফসলের ওপর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কতটা অধিকার রয়েছে তাঁদের?
বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের জীবন এই প্রশ্নগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, সম্পদের অসম বণ্টন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত তাঁদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে। তাই প্রকৃতি রক্ষা ও সমঅধিকারের লড়াই কেবল পরিবেশের প্রশ্ন নয়; এটি নারীর মর্যাদা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও ন্যায়সংগত সমাজ প্রতিষ্ঠারও প্রশ্ন।
কৃষিতে অবদান, স্বীকৃতি কোথায়?
বাংলাদেশের কৃষিতে গ্রামীণ নারীর অংশগ্রহণ বহুমুখী। ধান রোপণ, ফসল সংগ্রহ, বীজ সংরক্ষণ, শস্য শুকানো, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সবজি উৎপাদন, হাঁস-মুরগি পালন ও গবাদিপশু ব্যবস্থাপনায় তাঁদের শ্রম গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং জাতিসংঘ বাংলাদেশের ২০২৬ সালের ৭ জুন প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বাংলাদেশের কৃষিশ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার ৫৮ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফসল উৎপাদন থেকে শুরু করে মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও ফসল কাটার পরবর্তী ব্যবস্থাপনা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাঁদের ভূমিকা রয়েছে।
তবে কৃষিতে অংশগ্রহণ করলেই নারীর আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের শ্রমকে পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে কাজের অর্থনৈতিক মূল্য যথাযথভাবে স্বীকৃতি পায় না। উৎপাদনে অবদান রেখেও অনেক নারী জমির মালিকানা, ফসল বিক্রির অর্থের ওপর নিয়ন্ত্রণ কিংবা কৃষি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
বাংলাদেশের সরকারি এসডিজি ট্র্যাকার অনুযায়ী, ২০২০ সালের কৃষি শুমারিভিত্তিক তথ্যে কৃষিজমির মালিকানা বা নিরাপদ অধিকার থাকা কৃষি জনসংখ্যার অনুপাত পুরুষের ক্ষেত্রে ৪৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ, নারীর ক্ষেত্রে মাত্র ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ। কৃষিজমির মালিক বা অধিকারধারীদের মধ্যে নারীর অংশ ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ। এই ব্যবধান গ্রামীণ নারীর সম্পদগত বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে।
জমির মালিকানা না থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়া, কৃষি যন্ত্রপাতি কেনা, সরকারি সহায়তা গ্রহণ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন পরিকল্পনা করা কঠিন হতে পারে। উত্তরাধিকার ও সম্পত্তিসংক্রান্ত অধিকার বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সামাজিক রীতিনীতি, পারিবারিক চাপ ও প্রশাসনিক জটিলতা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই নারীর ক্ষমতায়নে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি জমি ও সম্পদের ওপর অধিকার, সহজ শর্তে ঋণ এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রকৃতি সংরক্ষণে নারীর জ্ঞান
গ্রামীণ নারীর সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ, দেশীয় জাতের ফসল চাষ, বাড়ির আঙিনায় সবজি উৎপাদন, জৈব উপাদান ব্যবহার এবং ছোট প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় তাঁদের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। কোন মৌসুমে কোন ফসল ভালো হয়, কোন বীজ স্থানীয় পরিবেশে টিকে থাকতে পারে কিংবা সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে কীভাবে পরিবারের খাদ্যের জোগান বাড়ানো যায়—এসব বিষয়ে তাঁদের রয়েছে বাস্তব জ্ঞান।
তবু পরিবেশ সংরক্ষণে নারীর অংশগ্রহণকে অনেক সময় গাছ লাগানো বা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সীমিত রাখা হয়। স্থানীয় বন, জলাভূমি, নদী, কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল মানুষের অভিজ্ঞতা পরিবেশ রক্ষার পরিকল্পনাকে আরও কার্যকর করতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়তি চাপ
ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, খরা, লবণাক্ততা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও তাপপ্রবাহ বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ জীবিকাকে চাপে ফেলছে। এসব সংকটের প্রভাব নারী ও পুরুষের জীবনে সব সময় সমান হয় না। উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানির সংকট দেখা দিলে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রে নারীদের ওপর পড়ে। দুর্যোগে ঘরবাড়ি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিবারের খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচর্যার দায়িত্বও তাঁদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে পরিবারের আয় কমে যায়। পরিবারের পুরুষ সদস্য কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে গেলে নারীদের একই সঙ্গে কৃষিকাজ ও পারিবারিক দায়িত্ব সামলাতে হতে পারে। ফলে জলবায়ু মোকাবিলার পরিকল্পনায় নারীর অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন ও সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য।
প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণে নতুন সুযোগ
আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি নারীর শ্রম কমাতে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। উন্নত বীজ, পানি সাশ্রয়ী সেচ, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার কৌশল, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ফসল সংরক্ষণ প্রযুক্তি ও ডিজিটাল বাজারব্যবস্থা তাঁদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কিন্তু এসব সুবিধা কাজে লাগাতে প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, তথ্যপ্রাপ্তি ও আর্থিক সক্ষমতা।
ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নারীদের জন্য নিয়মিত কৃষি প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি উপকরণ এবং বাজারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ নিশ্চিত করা দরকার। নারী কৃষকদের সমবায় ও উৎপাদক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল আর্থিক সেবায় তাঁদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
অদৃশ্য শ্রমের মূল্য
গ্রামীণ নারীর কাজ শুধু কৃষিক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। রান্না, সন্তান লালনপালন, বয়স্কদের পরিচর্যা, পানি সংগ্রহ ও জ্বালানির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি অনেক নারী আয়বর্ধক কাজেও অংশ নেন। ফলে একই দিনে তাঁদের ঘরের ভেতর ও বাইরে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২১ সালের সময় ব্যবহার জরিপ অনুযায়ী, নারীরা দৈনিক গড়ে প্রায় ৫ দশমিক ৯ ঘণ্টা অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজ এবং ১ দশমিক ২ ঘণ্টা পরিচর্যামূলক কাজে ব্যয় করেন। এসব কাজের অর্থনৈতিক মূল্য থাকলেও তা সাধারণত মজুরির হিসাবে প্রতিফলিত হয় না।
নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, উন্নত রান্নার প্রযুক্তি, শিশুযত্নকেন্দ্র ও পরিচর্যাসেবা সম্প্রসারণ করলে নারীর সময় সাশ্রয় হবে। এতে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, বিশ্রাম এবং আয়বর্ধক কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ বাড়বে।
সমঅধিকারে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ
গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রকৃতি সংরক্ষণকে একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। জমি ও সম্পদের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, দুর্যোগকালীন আর্থিক সহায়তা এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল কৃষি, লবণ ও খরাসহিষ্ণু ফসল, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং স্থানীয় বীজ রক্ষার উদ্যোগে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
কৃষি সমবায়, পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি, দুর্যোগ প্রস্তুতি কমিটি ও পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রমে নারীদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব থাকা প্রয়োজন। তাঁদের শ্রমের পরিমাণ, কাজের সময়, আয় এবং অবৈতনিক কাজের হিসাব নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করতে হবে। শিক্ষা, কৃষি প্রযুক্তি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের সুযোগও সম্প্রসারণ করতে হবে।
গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন শুধু নারী উন্নয়নের কর্মসূচি নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, দারিদ্র্য হ্রাস, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির শর্ত। যে নারী বীজ সংরক্ষণ করেন, তিনি ভবিষ্যৎ ফসলের সম্ভাবনা রক্ষা করেন। যে নারী প্রতিকূল আবহাওয়ায় কৃষিকাজ চালিয়ে যান, তিনি পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা ধরে রাখতে ভূমিকা রাখেন।
অথচ তাঁদের শ্রমকে অবমূল্যায়ন করে, সম্পদের অধিকার সীমিত রেখে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে দূরে সরিয়ে রেখে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। গ্রামীণ নারীকে শুধু কৃষিশ্রমিক হিসেবে নয়, কৃষি উদ্যোক্তা, পরিবেশ সংরক্ষক, জ্ঞানসম্পন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ও উন্নয়নের সমান অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
প্রকৃতি রক্ষা ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা পরস্পরের পরিপূরক। নারীর অধিকার নিশ্চিত হলে শক্তিশালী হবে গ্রামীণ অর্থনীতি, সুরক্ষিত হবে পরিবেশ এবং আরও ন্যায়সংগত হয়ে উঠবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।