বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক শিল্পায়ন ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের ‘বিগ-বি’ উদ্যোগে ভারতকে সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব সামনে আনতে পারে টোকিও। জাপানের বৃহত্তর ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি আসন্ন শীর্ষ বৈঠকে আলোচনায় আসতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর নির্ধারিত রয়েছে। সফরে দুই দেশের বর্তমান কৌশলগত অংশীদারত্বকে সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্বে (সিএসপি) উন্নীত করার বিষয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জাপানের কূটনৈতিক কাঠামোয় সিএসপি তুলনামূলক বিস্তৃত সহযোগিতার সম্পর্ক, যেখানে নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও অন্যান্য খাতে সমন্বিত কাজের সুযোগ থাকে।
‘বিগ-বি’ উদ্যোগের লক্ষ্য বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি জ্বালানি এবং পরিবহন অবকাঠামো উন্নত করা। ২০১৪ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের উদ্যোগে পরিকল্পনাটি শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার করিডোরকে কেন্দ্র করে শিল্পায়ন ও সংযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ বাড়ানোর অন্যতম অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে জাপানের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে। ওই অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ সহজ করা এবং বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে জাপানের স্বার্থ রয়েছে। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও দুই দেশের স্বার্থ জড়িত। রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে ভারতকে বিগ-বিতে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
ভারতের জাপানি দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রায় ৩৮৫ বিলিয়ন ইয়েন উন্নয়ন সহায়তা দিয়েছে জাপান। এই সহায়তার বড় অংশ অবকাঠামো ও যোগাযোগ খাতে ব্যয় হয়েছে। ২০২৩ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা ভারত সফরে গিয়ে বঙ্গোপসাগরকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। একই বছর বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে জাপান ‘বে অব বেঙ্গল-নর্থইস্ট ইন্ডিয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভ্যালু চেইন ইনিশিয়েটিভ’ নামে আরেকটি বিস্তৃত প্রস্তাব দেয়।
বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত ইয়োয়ামা কিমিনোরি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বলেছিলেন, মুক্ত ও উন্মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার এক অনুষ্ঠানে তিনি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে শুধু দ্বিপাক্ষিক ব্যবহারের অবকাঠামো নয়, বরং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত করার উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেন। এ লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বোঝাপড়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের কিছু জটিলতা আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোচনায় প্রভাব ফেলেছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচি ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করেও অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের অধিকাংশ সময় বৈঠক করতে পারেননি।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান অংশ নেবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। মঙ্গলবার এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, সময়সূচি মিলে গেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সফরে যোগ দেবেন। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক ঘোষণায় আশা প্রকাশ করেছে, এ সফর দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করবে এবং পরিমার্জিত মুক্ত ও উন্মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বাস্তবায়নে সমন্বয় বাড়াবে।
মাতারবাড়ীকে আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাবের বিষয়ে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ভবিষ্যৎ আমদানি-রপ্তানির চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশের বন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। দেশের নিজস্ব চাহিদা পূরণের পর মাতারবাড়ী বন্দর অতিরিক্ত পণ্য সামলাতে পারলে এর বৃহত্তর আঞ্চলিক ব্যবহার নিয়ে বিবেচনা করা হবে।