দেশের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় ব্যয়বহুল ও অস্থায়ী ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ, অব্যবহৃত ছাদ ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির নতুন প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬ উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, কুইক রেন্টালের নামে অতিরিক্ত ব্যয়ের পথ অনুসরণ না করে কম খরচে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
সরকারপ্রধান জানান, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বিদ্যুৎ খাতের চুক্তি ও ব্যয় পর্যালোচনা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং জ্বালানির উৎস বাড়ানোর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে কাজ চলছে। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
এ লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল গঠনের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, অর্থের অভাবে কোনো উদ্যোক্তা যেন নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ হারান, তা সরকার চায় না। পাশাপাশি তরুণদের উদ্ভাবনী উদ্যোগ এগিয়ে নিতে চলতি বাজেটে স্টার্টআপ খাতে বছরে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
জ্বালানি আমদানিনির্ভরতার দুর্বলতা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক সংঘাত ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমদানি প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৪৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে সরকারকে। বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে ডিজেলের মজুত বৃদ্ধি, কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও জানান তিনি।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে বিশেষ আইনগত ও আর্থিক সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী জানান, ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ ২০২৬’ প্রণয়নের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কর ও শুল্ক সুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোলে গ্রীষ্মের আগেই জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কলকারখানা ও আবাসিক ভবনের অব্যবহৃত ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগাতে চান প্রধানমন্ত্রী। নেট মিটারিং ব্যবস্থায় নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কেনার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
নিজের বাসায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের অভিজ্ঞতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে চান তিনি।
কৃষি খাতেও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎচালিত সেচপাম্পের পরিবর্তে সৌরচালিত পাম্প চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ ব্যবহারে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান। দিনের বেলায় প্রাকৃতিক আলো কাজে লাগানো এবং অপ্রয়োজনে বৈদ্যুতিক বাতি, পাখা ও অন্যান্য যন্ত্র বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ খাতে স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়াতে উন্নয়ন সহযোগীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও এ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে উদ্ভাবনী ধারণা তুলে ধরা ‘স্ফুরণ: টেকসই জ্বালানি উদ্ভাবনের খোঁজে ২০২৬’ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব মিরানা মাহরুখসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই সোলার এক্সপোর প্রতিপাদ্য—‘প্রতি ইঞ্চি ছাদ কাজে লাগাই, সৌরবিদ্যুতে আয় বাড়াই’। বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইডকল যৌথভাবে আয়োজন করেছে এ প্রদর্শনীর।




