সুন্দরবনের নদী ও খালে মাছের বৈচিত্র্য নিয়ে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি উদ্বেগজনক চিত্রও উঠে এসেছে গবেষণায়। একদিকে আগে শনাক্ত হয়নি এমন সাত প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ির সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা। অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জলজ প্রাণীর মজুদ কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মাছ শিকারের অনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি বন্ধ করা না গেলে সুন্দরবনের জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
প্রায় দুই বছর ধরে পরিচালিত সমীক্ষায় ১৫টি মাছ ও চিংড়ির প্রজাতির মজুদ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে নয় প্রজাতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রবণতা পাওয়া গেলেও ছয়টির মজুদ হ্রাসের তথ্য উঠে এসেছে।
মজুদ বৃদ্ধির তালিকায় নয় প্রজাতি
গবেষণায় যেসব মাছ ও চিংড়ির সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা পাওয়া গেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে অলুয়া বা আমাদি, পারশে, ভেটকি বা কোরাল, পোয়া, দাতিনা, গ্যাগড়া টেংরা, পাঙ্গাস, হরিণা চিংড়ি ও চাকা চিংড়ি।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণে, সুন্দরবনের কোনো কোনো এলাকায় মিঠা পানির প্রবাহ বাড়ায় নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির বিস্তারে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তবে অঞ্চলভেদে মাছের প্রাচুর্য এবং আহরণের চাপের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
অন্যদিকে পায়রা, চিত্রা বা বিষতারা, নোনা টেংরা, কাইন মাগুর, গলদা চিংড়ি, বাগদা চিংড়ি ও শীলা কাঁকড়ার মজুদ কমার তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হকের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি গবেষক দল এই সমীক্ষা পরিচালনা করে। এতে সুন্দরবনের মাছের প্রাপ্যতা, প্রজাতির বৈচিত্র্য, মজুদের পরিবর্তন এবং সেগুলোর ওপর বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি পর্যালোচনা করা হয়। গবেষণা দলের প্রধানের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একসময় বনে বড় আকারের ভেটকি মাছের আধিক্য বেশি থাকলেও বর্তমানে ছোট আকারের কয়েকটি প্রজাতির উপস্থিতি তুলনামূলক বেড়েছে।
নতুন মাছ ও চিংড়ির পরিচয় মিলেছে
সুন্দরবনের জলজ প্রাণীর তালিকায় যুক্ত হয়েছে আগে নথিভুক্ত না হওয়া সাত প্রজাতির মাছ। এর মধ্যে রয়েছে এক ঠুঁইটা, কুলি বেলে, সবুজ বাইল বা ফোঁটা বেলে, ফোঁটা বাট ও বড় আইশ পারশে। বাকি দুটি প্রজাতির নাম প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। নতুন শনাক্ত হওয়া চিংড়ি দুটি হলো মাকড়সা চিংড়ি ও ফোঁটা চিংড়ি।
সমীক্ষার দুই বছরে সুন্দরবনে ২৬১ প্রজাতির মাছের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। পূর্ববর্তী গবেষণার তথ্যসহ হিসাব করলে এ বনে মাছের প্রজাতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮২টি।
বন অধিদপ্তরের ‘প্রটেকশন অব সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট প্রজেক্ট’-এর অধীনে আরণ্যক ফাউন্ডেশন ও সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ যৌথভাবে কাজটি করেছে। মাছের পাশাপাশি অন্যান্য জলজ প্রাণী, শামুক-ঝিনুক, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয়ও গবেষণায় স্থান পেয়েছে।
ধ্বংসাত্মক শিকারে বাড়ছে ঝুঁকি
সুন্দরবনের জলজ পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে বিষ ব্যবহার করে মাছ ধরা। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট মাছের পাশাপাশি পানিতে থাকা ছোট মাছ, পোনা এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে শুধু বর্তমান মজুদ নয়, ভবিষ্যৎ প্রজনন ও বংশবিস্তারের সক্ষমতাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পোনা সংগ্রহের সময় বাছবিচারহীনভাবে অন্যান্য ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী নষ্ট করাও পরিস্থিতিকে জটিল করছে।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোহাম্মদ জাকির হোসেনের মতে, সুন্দরবননির্ভর জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মাছের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রেও মৎস্যসম্পদ বড় অবদান রাখতে পারে।
তিনি অবৈধ শিকার বন্ধ, বিষ প্রয়োগ প্রতিরোধ এবং ছোট পোনা সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রজননের উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখা ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন।
অঞ্চলভেদে আলাদা ব্যবস্থাপনার পরামর্শ
গবেষণায় সুন্দরবনের কয়েকটি এলাকায় নির্দিষ্ট প্রজাতির ওপর অতিরিক্ত আহরণের চাপ চিহ্নিত হয়েছে। সাতক্ষীরা অঞ্চলে ভেটকি মাছের নির্বিচার শিকার নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করা হয়েছে। এ জন্য আহরণের পরিমাণ নির্ধারণ, প্রজননকালে মাছ ধরা বন্ধ এবং পোনা রক্ষার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
খুলনা ও শরণখোলা এলাকায় পাঙ্গাসের মজুদ রক্ষায় নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। শরণখোলায় গ্যাগড়া টেংরার ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত আহরণের ঝুঁকি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি কাইন মাগুর, শীলা কাঁকড়া, গলদা ও বাগদা চিংড়ি সংরক্ষণেও বিশেষ পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন গবেষকেরা।
তাদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে মাছ ধরার জালের ফাঁসের নির্দিষ্ট মাপ চালু, আহরণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ এবং প্রজনন মৌসুমে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা। এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাইয়ে নিয়মিত মজুদ পর্যবেক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গবেষণার সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ
বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক (খুলনা অঞ্চল) ইমরান আহমেদ জানিয়েছেন, সুন্দরবনের ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনা করা হবে। প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার আগে একটি কর্মশালা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে পাওয়া সুপারিশগুলো সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হবে। পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী।
গবেষকদের মূল্যায়নে, সুন্দরবনের সামগ্রিক মৎস্যসম্পদের অবস্থা এখনো আশাব্যঞ্জক। তবে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। উপকূলীয় অঞ্চলে তাপমাত্রা ও মিঠা পানির প্রবাহের পরিবর্তনের কারণে মাছের বিস্তার এবং প্রজাতিগত উপস্থিতিতেও প্রভাব পড়ছে।
সুন্দরবনের মিঠা পানি, আধা-লবণাক্ত ও অধিক লবণাক্ত পরিবেশে মাছের প্রাচুর্য এক রকম নয়। বাগেরহাটের দিকে মিঠা পানির মাছের উপস্থিতি বাড়ার প্রবণতা দেখা গেলেও অন্য এলাকায় লবণাক্ততা সহনশীল প্রজাতির বিস্তারে পরিবর্তন হচ্ছে।
গবেষণার পর্যবেক্ষণ বলছে, সুন্দরবনের জলজ সম্পদ সংরক্ষণে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে বিষ দিয়ে মাছ ধরা ও অনিয়ন্ত্রিত আহরণ বন্ধের পাশাপাশি প্রজননক্ষেত্র সুরক্ষিত করা না গেলে নতুন করে শনাক্ত হওয়া প্রজাতিসহ বিদ্যমান মৎস্যসম্পদও ভবিষ্যতে হুমকির মুখে পড়তে পারে।




