ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পর গ্রাম পর্যায়ে নির্বাচনি তৎপরতা বাড়ছে। সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীরা জনসংযোগ শুরু করেছেন, আবার কেউ কেউ দলীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিভিন্ন ইউনিয়নে জামায়াতের একক প্রার্থী অনেকটাই নির্ধারিত বলে জানা গেছে। 
বিপরীতে প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে বিএনপির সমর্থন পাওয়ার আশায় চার থেকে আটজন পর্যন্ত নেতা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। ফলে একজনকে বেছে নিয়ে বাকিদের তার পক্ষে কাজ করানো বিএনপির জন্য বড় সাংগঠনিক পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। একই পদে একাধিক নেতার আগ্রহ থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। 
নির্বাচনের আগে এই প্রতিযোগিতা দলীয় বিরোধে রূপ নেয় কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা এবং আওয়ামী লীগের কিছু তৃণমূল কর্মী-সমর্থকের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সরকার ও বিএনপির কাছে তথ্য রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাঁচ ধাপে ভোটের পরিকল্পনা
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, পাঁচ ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপের ভোট আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি, দ্বিতীয় ধাপের ৪ ফেব্রুয়ারি, তৃতীয় ধাপের ২৯ এপ্রিল, চতুর্থ ধাপের ১৩ মে এবং পঞ্চম ধাপের ভোট ২৭ মে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। 
গত ১২ অক্টোবর রোডম্যাপ ঘোষণার পর সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচার আরও বেড়েছে। হাটবাজার, মসজিদ ও পাড়া-মহল্লায় মানুষের সঙ্গে দেখা করছেন অনেকে। কেউ বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমর্থন চাইছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন। বিএনপির সমর্থন পেতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ কেউ রাজধানীতে গিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। 
আবার কেউ স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। দুর্গাপূজার ছুটিতে বিএনপির সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় গেলে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীরা তাদের সঙ্গে দেখা করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েকজন প্রার্থী অতীতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণও তুলে ধরছেন। এর মধ্যে মামলা, কারাবরণ, হামলার শিকার হওয়া এবং মিছিল-সমাবেশে অংশ নেওয়ার তথ্য রয়েছে।
একক প্রার্থী দেওয়ার নির্দেশনা
গত ১১ অক্টোবর সংসদ ভবনে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় একক প্রার্থী নিশ্চিত করার বিষয়ে নির্দেশনা দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই ইউনিয়নে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে দলের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে একজনকে সমর্থন দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ আলাদা অবস্থান নিলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। তবে বিএনপির নেতারা জানিয়েছেন, প্রার্থী বাছাইয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। 
সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর সবাইকে একজনের পক্ষে একত্র করা কতটা সহজ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের আশঙ্কা, একাধিক প্রার্থীর মধ্যে সমঝোতা না হলে স্থানীয় বিরোধ বাড়তে পারে। তাই আলোচনার মাধ্যমে কাউকে প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি করানো এবং শেষ পর্যন্ত দলীয় ঐক্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তফসিলের পর শুরু হতে পারে আনুষ্ঠানিক বাছাই
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, স্থানীয় পর্যায়ে তফসিল ঘোষণা করা হবে। ভোটের অন্তত ছয় সপ্তাহ আগে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা তফসিল প্রকাশ করবেন। বিএনপি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তফসিল ঘোষণার পর দলীয় সমর্থন নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, প্রার্থিতা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে এখনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। 
তবে জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তারেক রহমান দলীয় ঐক্য বজায় রাখা এবং একক প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এদিকে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য বিএনপি মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করছে বলে জানা গেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা ও অতীত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য নিয়ে দলীয় নেতৃত্বকে প্রতিবেদন দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
আওয়ামী লীগের তৃণমূলের অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ
ইউপি নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিছু কর্মী-সমর্থক অংশ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন—এমন আশঙ্কাও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
 স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ধারণা, তফসিল ঘোষণার পর আত্মগোপনে থাকা কিছু নেতা-কর্মী প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। তবে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে কী ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে নির্বাচনের আগে বিএনপিকে নিজেদের প্রার্থী বাছাইয়ের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
২০৩ আসনে বিশেষ বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন
ইউপি নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ ৫১ কোটি ১৮ লাখ টাকার বিশেষ বরাদ্দ দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০৩টি আসনের সংসদ সদস্যরা নিজেদের পছন্দের প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ পাবেন। আগামী বছরের ৩০ জুনের মধ্যে বরাদ্দের অর্থ ব্যয় করতে হবে। বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন—এমন আসনের ইউনিয়নগুলোকে এই বরাদ্দের বাইরে রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
 তবে সিলেট-৫ আসনের ইউনিয়নগুলো বরাদ্দের আওতায় এসেছে, যেখানে খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্য রয়েছেন। জামায়াত অভিযোগ করেছে, নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদের পছন্দমতো প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এ বরাদ্দ করা হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এর ফলে নির্বাচনের পরিবেশে প্রভাব পড়তে পারে।