রাজধানীর প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছে সরকার। আবদুল গনি রোডের বর্তমান সচিবালয়ের পরিবর্তে শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন সচিবালয় নির্মাণের প্রস্তাব আজ মন্ত্রিসভার বৈঠকে উঠছে। প্রস্তাবিত কমপ্লেক্সে ৫৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে স্থান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শেরেবাংলা নগরের সড়কব্যবস্থা, যানজট, নগর পরিকল্পনা এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রায় ৩০ লাখ বর্গফুট আয়তনের নতুন প্রশাসনিক কমপ্লেক্সে ১২ থেকে ১৪ তলাবিশিষ্ট ১২টি ভবন নির্মাণ করা হবে। এর সঙ্গে থাকবে কেন্দ্রীয় মসজিদ, সম্মেলন কেন্দ্র, শরীরচর্চার ব্যবস্থা, ফোয়ারা, গাড়ি রাখার স্থান এবং ভবনগুলোর চারপাশে চক্রাকার সড়ক। আজ বিকেল ৪টায় মন্ত্রিসভায় প্রস্তাবটি উপস্থাপনের কথা রয়েছে। অনুমোদন পেলে প্রকল্পের পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে নির্মাণকাজ শুরুর সময়, চূড়ান্ত নকশা ও ব্যয় সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।
বর্তমানে আবদুল গনি রোডের সচিবালয়ে ৩৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব ভবনের মোট আয়তন প্রায় ১৮ লাখ বর্গফুট। নতুন কমপ্লেক্সে জায়গা বাড়িয়ে ৫৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে এক জায়গায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এতে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা ও বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় সহজ হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন থেকে নতুন পরিকল্পনা
সচিবালয়ের ১২টি প্রধান ভবনের মধ্যে আটটির অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এসব ভবনের অধিকাংশই ষাটের দশকে নির্মিত। পুরোনো অবকাঠামো, জায়গার সীমাবদ্ধতা এবং আধুনিক কর্মপরিবেশের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে নতুন সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এর আগে বর্তমান সচিবালয় প্রাঙ্গণেই ২১ তলা একটি ভবন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এতে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা। প্রস্তাবটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হলেও তাতে সম্মতি দেওয়া হয়নি। পরিবর্তে শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় নির্মাণের সম্ভাবনা যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং স্থাপত্য অধিদপ্তর নতুন পরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু করে।
প্রস্তাবিত ভবনগুলোর নকশায় শেরেবাংলা নগরের মূল পরিকল্পনা এবং জাতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি লুই আই কানের স্থাপত্যভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। স্থাপত্য অধিদপ্তরের একাধিক দল নকশা তৈরির কাজ করেছে। সেখান থেকে একটি নকশা চূড়ান্ত করে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মকক্ষের বিন্যাসেও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। অধিকাংশ কর্মকর্তার জন্য পৃথক কক্ষের বদলে কাচ বা বোর্ড দিয়ে বিভক্ত খোলা অফিসব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রশাসনের সর্বোচ্চ দুই স্তরের কর্মকর্তাদের জন্য পৃথক কক্ষ রাখার কথা বলা হয়েছে।
সড়ক ও যানজট নিয়ে উদ্বেগ
নতুন সচিবালয় নির্মাণের সঙ্গে আশপাশের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের পরিকল্পনাও যুক্ত হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, কমপ্লেক্সের চারপাশে চক্রাকার সড়ক নির্মাণ করা হবে। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পেছন দিয়ে একটি সংযোগ সড়ক তৈরি করে তা জুলাই স্মৃতি জাদুঘর—সাবেক গণভবনের পাশ দিয়ে মিরপুর সড়কের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে ওই এলাকায় স্কুল, হাসপাতাল, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। নতুন সড়ক নির্মাণে এসব স্থাপনার অবস্থান ও জমির ব্যবহার বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো কোনো স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে। এ ছাড়া বিজয় সরণি থেকে আগারগাঁও হয়ে মিরপুর ১০ নম্বরের দিকে যাওয়া সড়কের নিচ দিয়ে পাতাল সড়ক নির্মাণের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। তবে এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন আলাদা সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের একাংশ শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় নির্মাণের স্থান নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। স্থপতি ইকবাল হাবিবের মতে, ওই এলাকার মূল পরিকল্পনা ও বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। সেখানে ইতিমধ্যে অনেক সরকারি কার্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থাকায় নতুন সচিবালয় নির্মিত হলে যানবাহনের চাপ বাড়তে পারে। তার মতে, বিকল্প স্থান বিবেচনার পাশাপাশি সড়কব্যবস্থা, জনসাধারণের যাতায়াত এবং সামগ্রিক নগর পরিকল্পনা সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আপত্তি
নতুন সচিবালয়ের প্রস্তাবিত স্থান নিয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের একাংশও আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, প্রকল্পের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ বিষয়ে তারা সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগের বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাদের দাবিগুলো সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আরও বড় বা উপযুক্ত জায়গা বরাদ্দের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ কেন
পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠটি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন। ২০২১ সালে বাণিজ্য মেলা পূর্বাচলে স্থানান্তরের পর থেকে মাঠটির বড় অংশ অব্যবহৃত রয়েছে। সেখানে পার্ক নির্মাণে প্রায় ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারি জমির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়টিও নতুন সচিবালয়ের স্থান নির্বাচনে বিবেচনায় এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে পরিবেশ, আশপাশের জনবসতি ও যানবাহনের চাপের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা এবারই প্রথম নয়। ২০১৫ সালে একই এলাকায় প্রশাসনিক কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ২০৯ কোটি টাকা। জিয়া উদ্যানের উত্তর দিকে এবং বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পশ্চিম পাশে প্রায় ৩২ একর জমিতে কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নতুন নকশার খসড়া জমা দেওয়ার কথা ছিল। নতুন কমপ্লেক্সে সচিবালয় স্থানান্তর করা হলে আবদুল গনি রোডের বর্তমান ভবনগুলোতে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়সহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন সরকারি দপ্তর স্থানান্তরের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সব মিলিয়ে, নতুন সচিবালয় নির্মাণের প্রস্তাব কেবল প্রশাসনিক দপ্তর স্থানান্তরের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সরকারি জমির ব্যবহার, যোগাযোগব্যবস্থা, যানজট, নগর পরিকল্পনা ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পর প্রকল্পের পরবর্তী ধাপ স্পষ্ট হবে। তবে বাস্তবায়নের আগে এসব চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তার ওপরই প্রকল্পটির কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
ক্যাপশন: শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয় নির্মাণের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উঠছে। ছবি: সংগৃহীত