দরিদ্র পরিবারের আয় বাড়ানোর প্রত্যাশা অনেক সময় ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে নতুন ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অনেককে। এতে খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের জন্য অর্থের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দরিদ্রতম ২০ শতাংশ ঋণগ্রহীতা পরিবারের ৭৯ শতাংশ মাসিক আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি ব্যয় করছে কিস্তি পরিশোধে।
বিআইডিএসের গবেষক কাজী ইকবালের ‘২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশের গ্রামীণ ঋণবাজারের কাঠামোগত রূপান্তর: কে ঋণ দেয়, কী উদ্দেশ্যে, কোন শর্তে এবং কী ব্যয়ে (২০০০–২০২২)’ শীর্ষক গবেষণায় গ্রামীণ ঋণব্যবস্থার এই চিত্র উঠে এসেছে। সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিআইডিএসের সম্মেলনকক্ষে খাদ্যব্যবস্থায় অর্থায়নবিষয়ক এক কর্মশালায় গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করা হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ঋণগ্রহীতা পরিবারগুলোর মধ্যে আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি কিস্তি পরিশোধে ব্যয় করার হার ২২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশ হয়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার ৪৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এখানে ৭৯ শতাংশ বলতে আয়ের ৭৯ শতাংশ কিস্তিতে ব্যয় বোঝানো হয়নি; বরং দরিদ্রতম ঋণগ্রহীতা পরিবারের ৭৯ শতাংশ তাদের আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি ঋণ পরিশোধে ব্যয় করছে।
ঋণ বাড়ছে, বাড়ছে নির্ভরতা
গ্রামীণ এলাকায় ঋণ নেওয়া পরিবারের হার ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে। এসব ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশ আসছে এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে। তবে ঋণ পাওয়ার সুযোগ বাড়লেও তা পরিশোধের সক্ষমতা সব পরিবারের ক্ষেত্রে বাড়েনি।
গবেষণায় দেখা গেছে, মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে এনজিও থেকেও ঋণ নেওয়ার হার গত এক দশকে ২৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৯ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ, কিছু পরিবারকে এক উৎসের ঋণ সামলাতে অন্য উৎস থেকে অর্থ নিতে হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি আগের ঋণের কিস্তি পরিশোধের ঘাটতি পূরণেও মহাজনি ঋণের আশ্রয় নিতে হচ্ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ঋণের সুদ ও প্রকৃত ব্যয়ও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় ব্যাংকের সুদের হার প্রায় ১০ শতাংশ, এনজিওর ফ্ল্যাট সুদের হার ১৫ শতাংশ এবং মহাজনি ঋণের সুদের হার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বলা হয়েছে। গবেষক কাজী ইকবাল জানান, এনজিওর ১৫ শতাংশ ফ্ল্যাট সুদের কার্যকর হার প্রায় ২৭ শতাংশ হতে পারে। তাই ঋণের শর্ত মূল্যায়নে শুধু ঘোষিত সুদের হার নয়, প্রকৃত ব্যয়ও বিবেচনা করা দরকার।
কৃষিঋণে কিস্তির সময় বড় বিষয়
গ্রামীণ ঋণের একটি অংশ কৃষিকাজে ব্যয় হয়। সার, বীজ, গবাদিপশু কেনা ও জমি ইজারা নেওয়ার মতো কাজে ঋণ ব্যবহার করেন কৃষকেরা। কিন্তু কৃষিতে বিনিয়োগের পর আয় পেতে সময় লাগে। ফসল বিক্রির আগেই কিস্তি পরিশোধের সময় চলে এলে কৃষক আর্থিক সংকটে পড়তে পারেন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এনজিওগুলোর কৃষিঋণে সাপ্তাহিক কিস্তির পরিবর্তে মাসিক কিস্তির প্রচলন বেড়েছে। কৃষি মৌসুমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কিস্তি দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু হয়েছিল, তবে তা স্থায়ী হয়নি। ফলে ঋণের কিস্তি নির্ধারণে কৃষকের আয় আসার সময় বিবেচনা করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কর্মশালায় ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, শুধু জাতীয় পর্যায়ে ঋণের পরিমাণ নয়, পরিবার পর্যায়ে ঋণের চাপও বিশ্লেষণ করতে হবে। আয় ও সম্পদের তুলনায় ঋণের পরিমাণ বেশি হলে কিস্তি পরিশোধ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এর প্রভাব ঋণগ্রহীতার পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্রঋণের সর্বোচ্চ সেবামাশুল ২৪ শতাংশ নির্ধারিত থাকলেও প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে এই হারে সেবামাশুল নিতে হয় না। প্রতিযোগিতা বাড়লে সেবামাশুল কমার কথা, কিন্তু প্রতিযোগিতার ঘাটতির কারণে তা কমছে না।
কৃষক কার্ডে ১০ ধরনের সেবার পরিকল্পনা
কর্মশালার প্রধান অতিথি কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান বলেন, সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা হয়েছে। এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকেরা ১০ ধরনের মৌলিক সেবা পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে স্বল্পমূল্যে কৃষি উপকরণ, সার ও বীজের প্রণোদনা, আবহাওয়াসংক্রান্ত বার্তা এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ।
কৃষিপণ্যের বাজারে দামের অস্থিরতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। কাঁচামরিচের দাম কেজিপ্রতি ২০০ টাকায় উঠলে ভোক্তারা চাপে পড়েন। আবার উৎপাদনের মৌসুমে টমেটোর দাম দুই টাকায় নেমে এলে কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েন। আলুর উদ্বৃত্ত উৎপাদনের বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা ও উদ্যোক্তার ঘাটতির বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এবার পেঁয়াজ আমদানি না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে পেঁয়াজ, টমেটো ও কাঁচামরিচ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে।
কর্মশালায় আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইএফপিআরআই) তিনটি গবেষণা উপস্থাপন করা হয়। গবাদিপশু খাতে অর্থায়ন ও ঝুঁকি ভাগাভাগি নিয়ে কেট অ্যাম্বলার, কৃষিযন্ত্র ও কৃষিসেবা খাতে অর্থায়ন নিয়ে মেহরাব বখতিয়ার এবং শহরের পথখাবার বিক্রেতাদের অর্থায়ন নিয়ে কার্লি ট্র্যাচটম্যান গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ ঋণব্যবস্থায় শুধু ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। ঋণগ্রহীতার আয়, কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা, সুদের প্রকৃত ব্যয় এবং কৃষি বা অন্যান্য কাজ থেকে আয় আসার সময় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে দরিদ্রতম পরিবারের ৭৯ শতাংশ যখন আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি কিস্তিতে ব্যয় করছে, তখন ঋণ যেন নতুন আর্থিক সংকটের কারণ না হয়, সে বিষয়ে নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।